গত সপ্তাহে ভারতের মহারাষ্ট্রের অমরাবতীর একটি সরকারি হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) অগ্নিকাণ্ডে তিন নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এর মাত্র দুই দিন পর পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের অন্যতম প্রধান সরকারি হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারায় ১৪ নবজাতক। দুটি ঘটনাই রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবা খাতের চরম অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার নগ্ন চিত্র তুলে ধরেছে।
অমরাবতীর অগ্নিকাণ্ডের কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ ভেন্টিলেটরকে দায়ী করা হচ্ছে, অন্যদিকে ইসলামাবাদের ঘটনায় এয়ারকন্ডিশনার বিস্ফোরণকে অগ্নিকাণ্ডের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই উদ্ধারকারী দলের পৌঁছাতে বিলম্ব এবং হাসপাতালের মৌলিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। অগ্নিকাণ্ডের সময় জরুরি রোগী সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াও ছিল চরমভাবে ব্যাহত।
দুই দেশের সীমান্তের দুই পাশে সন্তান হারানো মা-বাবার আর্তনাদ ও হাহাকার যেন একই সুরের। অমরাবতীতে এক বাবা সন্তানের জন্মের আনন্দে মিষ্টি বিতরণের অপেক্ষায় ছিলেন, আর ইসলামাবাদে একটি পরিবার বহু বছর পর প্রথম পুত্রসন্তানের জন্ম উদ্যাপন করছিল। অথচ মুহূর্তের মধ্যে তাদের সব স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ঘটনার পর উভয় দেশের রাজনীতিকেরা শোক প্রকাশ করেছেন, উচ্চপর্যায়ের তদন্তের ঘোষণা দিয়েছেন এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অগ্নিনিরাপত্তা নিরীক্ষার কথাও বলা হয়েছে, তবে এসব আশ্বাস বারবারই কেবল লোক দেখানোয় পরিণত হয়।
দীর্ঘ ২৬ বছরের স্বাস্থ্যবিষয়ক সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় ভারত ও পাকিস্তানে হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ডের অসংখ্য ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। ভারতে ২০১১ সালে এএমআরআই হাসপাতালে আগুনে ৮৯ জন এবং ২০১৬ সালে ভুবনেশ্বরের এসইউএম হাসপাতালে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল। পাকিস্তানেও ২০১২ সালে লাহোরের সার্ভিসেস হাসপাতালে ১০ নবজাতক এবং ২০২৪ সালে সাহিওয়াল টিচিং হাসপাতালে ১১ শিশুর মৃত্যু হয়। এসব ঘটনায় বিপুল প্রাণহানি ঘটলেও নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় কোনো টেকসই পরিবর্তন আসেনি, এমনকি কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার নজিরও বিরল।
এই অগ্নিকাণ্ডগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং দুই দেশের গণতন্ত্রের গভীরতম বাস্তবতার প্রতিফলন। ভারত ও পাকিস্তান ক্রিকেট, সামরিক শক্তি প্রদর্শন ও কূটনৈতিক লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকলেও সাধারণ মানুষের জীবনকে যেন পকেটের খুচরো পয়সার মতো তুচ্ছ মনে করা হয়। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের মানুষের জীবনকে বিসর্জন দেওয়াটা যেন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
এ মাসের শুরুতে ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই স্বাধীনতার ৭৯ বছর পূর্তি উদ্যাপন করেছে। দুই দেশই নিজেদের গৌরবময় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কথা বলে গর্ব করে। অথচ রাষ্ট্রের এই দীর্ঘ পথচলায় সাধারণ নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। প্রয়োজনীয় জ্ঞান বা সম্পদের অভাব নেই, বরং পরিবর্তন না আনার সিদ্ধান্তটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যা কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য নয়।
বারবার এমন ঘটনার পরও আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা ও নাগরিক সমাজ কেন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না, তা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা আশা করা যেন এখন দুষ্কর। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যখন কান্নারত মায়ের সামনে দাঁড়ান, তখন সামরিক শক্তি ও পারমাণবিক অস্ত্রের তুলনায় সাধারণ মানুষের জীবনের গুরুত্ব তাঁদের কাছে আসলে কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
সবচেয়ে ভয়াবহ হলো সেইসব পরিবারের স্মৃতি, যারা পোড়া শিশুদের কালো ছাইয়ে ঢাকা দেহ দেখার মতো বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। রাষ্ট্রের এই নির্মম ও উদাসীন আচরণ যেন মধ্যযুগের কোনো অন্ধকারের কথা মনে করিয়ে দেয়। যতক্ষণ না সরকার সাধারণ মানুষের জীবনকে অগ্রাধিকারের তালিকায় শীর্ষে রাখবে, ততক্ষণ এমন ট্র্যাজেডি হয়তো চলতেই থাকবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর ইসলামাবাদে আগুনের সূত্রপাত হয় একটি এয়ারকন্ডিশনার বিস্ফোরণ থেকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দুই দেশেই বাবা-মায়েরা সরকারি হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে ঘটনার কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি তখনো নিজের সন্তানের মুখ দেখেননি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরিস্থিতি আলাদা হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা এবং সরকারি প্রতিক্রিয়ায় ছিল একই চিত্র। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যুদ্ধ বাধলে পাকিস্তান ও ভারত— কার কী ক্ষতি হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু আগুনের ধোঁয়া মিলিয়ে যাওয়ার পর এই দুই ঘটনা একটি অত্যন্ত লজ্জাজনক সত্য সামনে আনে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২৬ বছর ধরে স্বাস্থ্যবিষয়ক সাংবাদিক হিসেবে আমি ভারত ও পাকিস্তানে হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ড দেখেছি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই পুরোনো ঘটনাগুলো আমার মনে পড়ছে; কারণ, অমরাবতী ও ইসলামাবাদের সর্বশেষ আগুনকে শুধু ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতি বা কোনো ব্যক্তির অবহেলার ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
Leave a Reply