আমাদের সমাজে আত্মহত্যা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হলেও একে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য ভুল ধারণা বা মিথ। এই কুসংস্কারগুলো মানসিক সংকটে থাকা ব্যক্তিদের প্রতি অবহেলা তৈরি করে, যা পরোক্ষভাবে আত্মহত্যার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আত্মহত্যার মতো জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিষয়কে বুঝতে হলে আমাদের প্রচলিত সামাজিক অন্ধবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবতাকে স্বীকার করা জরুরি।
অনেকের ধারণা, যারা আত্মহত্যার কথা মুখে বলে তারা কেবল মনোযোগ পেতে চায়, বাস্তবে এমন সিদ্ধান্ত নেয় না। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, যারা আত্মহত্যা করে তাদের একটি বড় অংশই ঘটনার আগে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাদের ইচ্ছার কথা প্রকাশ করে। ‘আমার আর বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই’—তরুণদের এমন কথাকে অবহেলা করা উচিত নয়। এটি মূলত সাহায্যের জন্য তাদের নীরব আকুতি, যা সময়মতো ধরতে না পারলে মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
আরেকটি প্রচলিত মিথ হলো, আত্মহত্যা নিয়ে সরাসরি কথা বললে মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়। অথচ নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, তীব্র হতাশায় থাকা ব্যক্তিকে যদি সহমর্মিতার সঙ্গে সরাসরি প্রশ্ন করা হয় যে সে নিজের ক্ষতি করার কথা ভাবছে কি না, তবে তার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। সরাসরি কথা বললে ভুক্তভোগী ব্যক্তি তার মনের অবরুদ্ধ আবেগ প্রকাশের একটি নিরাপদ জায়গা খুঁজে পায়।
সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যান তাঁর সামাজিক কলঙ্ক তত্ত্বে ব্যাখ্যা করেছেন যে, সমাজ যখন কোনো মানসিক অবস্থাকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ মনে করে, তখন সেখানে তীব্র অবজ্ঞার জন্ম হয় (গফম্যান, ১৯৬৩)। আমাদের সমাজে কেউ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বললে তাকে ‘কাপুরুষ’ বা ‘দুর্বল’ বলে দেগে দেওয়া হয়। এই কলঙ্কের ভয়ে ভুক্তভোগী ব্যক্তি তার কষ্ট লুকিয়ে ফেলে, যা সংকটকে আরও ঘনীভূত করে।
মনোবিজ্ঞানী টমাস জয়নরের তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ তখনই আত্মহত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় যখন তার মধ্যে দুটি তীব্র অনুভূতি কাজ করে—সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার তীব্র একাকিত্ব এবং নিজেকে পরিবার বা সমাজের জন্য ‘বোঝা’ মনে করা (জয়নর, ২০০৫)। সামাজিক বর্জন ও উপহাসের কারণে ভুক্তভোগী ব্যক্তির মনে এই অনুভূতিগুলো চরম আকার ধারণ করে, যা তাকে আত্মহননের দিকে ধাবিত করে।
অনেকে মনে করেন কেবল গভীর মানসিক রোগে আক্রান্তরাই আত্মহত্যা করেন। এটি ভুল ধারণা। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, পড়াশোনার চাপ ও দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের ব্যাঘাতের মতো আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ সমস্যাও অনেক সময় তরুণদের মনে আত্মহত্যার চিন্তা তৈরিতে ভূমিকা রাখে (আহমেদ ও অন্যান্য, ২০২৪)। এছাড়া হঠাৎ অর্থনৈতিক ক্ষতি, সামাজিক লোকলজ্জা বা সাইবার বুলিংয়ের মতো ঘটনাও তাৎক্ষণিক আত্মহননের পথ বেছে নেওয়ার কারণ হতে পারে।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রথম ধাপ হলো ভুল ধারণাগুলোর প্রাচীর ভেঙে ফেলা। যখন আমরা কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে মানসিক সংকটকে একটি স্বাভাবিক রোগ হিসেবে দেখতে শিখব, তখনই কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের চারপাশের মানুষদের অবহেলা না করে তাদের কথা মন দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার মানসিকতাই পারে একটি মূল্যবান জীবন বাঁচাতে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আত্মহত্যা: তারুণ্যের এই হতাশার দায় কার। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ওভারপ্যারেন্টিং, স্বপ্নপূরণে জোরজবরদস্তি ও আত্মহত্যা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সমাজ ও পরিবারে এই ভয়ে অনেকেই বিষণ্নতায় ভোগা মানুষের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে ইতস্তত করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এরই ধারাবাহিকতায় মনোবিজ্ঞানী টমাস জয়নরের আত্মহত্যার আন্তব্যক্তিক তত্ত্বটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এটি মস্তিষ্কের এমন একটি অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি তার বিচারবুদ্ধি সাময়িকভাবে হারিয়ে ফেলে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইমদাদুল হক তালুকদার মানসিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মতামত লেখকের নিজস্ব।
Leave a Reply