জাহাঙ্গীর কবির নানক, যিনি তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য এবং দুবারের সাবেক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তিনি ভারতে আত্মগোপনে রয়েছেন। সম্প্রতি আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতি এবং দলের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন। নানক জানান, ১৯৬৯ সালের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে তার রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথচলায় তিনি বহু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। ১৯৭১ সালে তিনি ভারতে এসে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং পাকিস্তানি পাঞ্জাবি বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তার মতে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে যে অশুভ শক্তির যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই সময় থেকেই তাকে আত্মগোপনে জীবন কাটাতে হয়েছে।
৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে নানক বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি দেখেছেন কীভাবে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য অপমানজনকভাবে ভেঙে চুরমার করা হয়েছে এবং ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িটি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, ৫ আগস্ট যারা ক্ষমতা দখল করেছে, তারা মূলত বাংলাদেশবিরোধী এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। নিজের পালানোর প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি জানান, ৪ আগস্ট দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তিনি গণভবনে অবস্থান করেছিলেন এবং পরদিন ৫ আগস্ট তিনি সেখান থেকে চলে আসেন। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হত্যা মামলাগুলো নিয়ে তিনি বলেন, তার কাছে থাকা মামলার নথিপত্র অনুযায়ী কোথাও কোনো সাক্ষী তাকে সরাসরি জড়িত থাকার কথা বলেননি। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন, আইন ও আদালত যদি নিরপেক্ষভাবে চলে, তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা কোনো হত্যা মামলা বা আইসিটি মামলার কোনো ভিত্তি থাকবে না এবং এসব মামলার কোনো অস্তিত্ব টিকবে না।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতায় নানক নিজেকে একটি পরিবারের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রাজনীতি করতে গিয়ে যখন দল বা পরিবার সংকটে পড়ে, তখন তার দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি কথা বলছেন। তার মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল চেতনার পরিপন্থী। তিনি বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং আইনি লড়াইয়ে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হবেন। নানকের এই সাক্ষাৎকারটি এমন এক সময়ে এলো যখন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই আত্মগোপনে আছেন অথবা আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হচ্ছেন। তিনি তার বক্তব্যে বারবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা তুলে ধরে বর্তমান সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। তার এই সাক্ষাৎকারটি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে যখন দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং শীর্ষ নেতৃত্ব চাপের মুখে রয়েছে। নানক মনে করেন, সময় এবং সঠিক বিচারিক প্রক্রিয়া তাদের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগের অসারতা প্রমাণ করবে এবং ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ পুনরায় রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। তার এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি মূলত তার ব্যক্তিগত আত্মপক্ষ সমর্থনের একটি প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে তিনি নিজেকে একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি জাতীয় সংকট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এই পরিবারটি যখন ভালো না থাকে, তখন আমরা কেউ ভালো থাকি না মানসিকভাবে।
নানক: অনেক আত্মগোপনের ইতিহাস আছে আমার।
১৯৭১ সালে ভারতে আসা, ট্রেনিং নেয়া।
অস্ত্র নিয়ে ভেতরে ঢোকা, মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে যুদ্ধ করা, দেশ স্বাধীন করা ইত্যাদি।
কিন্তু খুব বড় আত্মগোপনে আমাদেরকে যেতে হয়েছে যেমন— খালেদা জিয়ার শাসনামল, অর্থাৎ বিএনপি ও জামায়াতের শাসনামলে।
আমরা কাজ করেছি, সংগঠন করেছি, মিটিং করেছি।
প্রশ্ন: দীর্ঘ সময় ঘর ছাড়া, দেশের কথা মনে পড়ে?
বন্ধু ও পরিজন-পরিবার কাদের কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে আপনার?
নানক: সত্যি কথা বলতে কী—আমরা কর্মী পাগল মানুষ তো।
১৯৭১ সালে আমি একেবারে পাকিস্তানি পাঞ্জাবী বাহিনীর বিরুদ্ধে ফ্রন্ট ফাইট করেছি।
যা ঘটলো ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে আমাদের চোখের সামনে আমরা একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেখছি যে, বঙ্গবন্ধুর স্ট্যাচু কী অপমানজনকভাবে তারা ভেঙেচুরে চুরমার করেছে।
ধানমন্ডি ৩২-কে ভেঙে গুড়িয়ে দিল বুলডোজার দিয়ে।
তখন তো প্রশ্ন জাগেই, আমি বেঁচে ছিলাম কেন?
বেঁচে আছি কেন বা এই ঘটনা দেখার আগে কেন মৃত্যু হলো না!
তারস্বরে আমি চিৎকার করে বলতে পারি যে, এই ঘটনার আগে যদি আমার মৃত্যু হতো, তাহলে সেই মৃত্যু হতো আমার শান্তির মৃত্যু।
আমরা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের স্বাধীনতা এনেছি।
ওরা স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল, সেই পরাজিত শক্তি প্রতিশোধ নিয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা, পায়ের জুতা খুলে গালে পিটানো, এগুলো দেখতে হয়েছে আমাদেরকে।
গত দু’বছরে কোনো রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি।
ভোরবেলা যে আজান দেয়, সেই ফজরের নামাজ পড়ার পরে একটু টায়ার্ড হয়ে শরীর যখন ছেড়ে দেয় তখন ঘুমাতে যাই।
আর আরেকটা মনে পড়ে—ছেলেটার কবরের কাছে যেতাম।
মা-বাবার কবরটার কাছে অনেকদিন যেতে পারি না।
এরা গণতন্ত্রবিরোধী, এরা মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি।
এরা পাকিস্তানের দালাল, পাকিস্তানপন্থী।
ওরা আবার এটাকে পাকিস্তান বানাতে চায়।
প্রশ্ন: আপনি কীভাবে প্রাণে বাঁচলেন, কীভাবে ভারতে এলেন, কারা আপনাকে সাহায্য করলেন?
আমি চলে আসলাম পরের দিন ফিফথ আগস্ট (৫ আগস্ট)।
আমি আসলে প্রায় একেবারে পড়েই গিয়েছিলাম আমার শোয়ার জায়গায়।
যখন আমার চৈতন্য উদয় হয়, তখন এক ক্লোজ রিলেশন এয়ারফোর্স, ও আমাকে ফোন করল।
তো বলল যে, চিন্তা করবেন না, উনি বর্ডার ক্রস করেছেন সেফলি।
তারপর তো একের পর শেল্টার চেঞ্জ করছি।
এরপরে একটি পর্যায়ে বুঝতে পারলাম যে, আমাকে এখন ধরার জন্য তারা মরিয়া হয়ে যাবে।
ডিসাইড করে ফেললাম—আই হ্যাভ টু লিভ দ্য কান্ট্রি।
আমার জামাই ডাক্তার, ফোন করল যে-বাবা আপনি বেরিয়ে যান।
আমি যেভাবে যেভাবে বলব সেভাবে বেরিয়ে যাবেন এবং সেই গাইডটা করেছে মূলত।
সে গাইডটা করে নিয়ে এসেছে, বের করে এনেছে।
কারণ ৫ আগস্ট তো—আর আমি ১৬ আগস্ট বর্ডার ক্রস করতেছি।
নানক: না না আমি তো ১৬ আগস্ট শিলংয়ে পৌঁছলাম।
বিকজ মালদাহতে আমার নাতি-নাতনি, মেয়েরা ওরা গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।
সেখান থেকে আমি পরের দিনে চলে আসলাম কলকাতায়।
প্রশ্ন: নেতাকর্মীদের বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে আসার কারণে অনেকেই শেখ হাসিনার সমালোচনা করেন।
আপনি একজন বর্ষীয়ান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে এই সিদ্ধান্তকে কীভাবে দেখেন?
নানক: ৫ আগস্ট যদি ৩০ মিনিট দেরি করতেন, তাহলে আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ওইদিন গণভবনে থাকা তার ছোট বোন শেখ রেহনাকে নির্মমভাবেই শুধু হত্যা করত না, নৃশংস নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করত।
আজকে বেঁচে আছেন বলেই আজ সারা বিশ্ব বিবেক, ১৮ কোটি মানুষের বিবেক মিলে কিন্তু বলছে যে, শেখ হাসিনা ছাড়া এই দেশ পরিচালনা মতো যোগ্য নেতৃত্ব আর দ্বিতীয় কেউ নেই।
প্রশ্ন: আচ্ছা ভারত সরকার কি আপনাকে কোনো নির্দিষ্ট রক্ষাকবজ দিয়েছে বা নির্দিষ্ট কোনো স্ট্যাটাস মানে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে চাপ এলে আপনার পদক্ষেপ কী হবে?
নানক: আমরা তো বিশ্বাস করি—যেকোনো চাপ বাংলাদেশের এই কচুপাতার পানির মতো যারা টলটলায়মান, সেই সরকারের কতখানি চাপ দেয়ার ক্ষমতা আছে?
এবং সে চাপ যতই যাই হোক না কেন—এটা সামাল দেয়ার ক্ষমতা ভারত সরকারের আছে।
প্রশ্ন: সরকার এবং দলের বিপর্যয়ের নেপথ্যে কী কী কারণ থাকতে পারে।
মানে যে ভুল আপনারা আর করবেন না, মানে আপনার মূল্যায়ন কি?
নানক: আমরা একটা গভীর ষড়যন্ত্রের, ডিপ স্টেট ষড়যন্ত্রের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম।
প্রশ্ন: ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকলেন পরপর টানা।
কিছুতেই বুঝতে পারলেন না যে কোথা থেকে এই লিকেজটা হলো?
নানক: না আমরা বুঝতে পারিনি—এ কথা আমি স্বীকার করবো না।
আমি যদি কিছুটা টের পেয়ে থাকি, তাহলে আমার নেত্রী—উনিও কিন্তু বুঝতে পেরেছিলেন।
উনি বুঝতে পেরেছিলেন বলেই কিন্তু ৬ মাস আগে থেকে বলা শুরু করেছেন যে, আমাকে ক্ষমতা থেকে নামানোর জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে, ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।
সাদা চামড়াওলারা এভাবে…কোট আনকোট আমি বলছি—‘সাদা চামড়াওয়ালারা আমাকে ক্ষমতা থেকে নামাতে চায়’।
ইউনূস আমার বিরুদ্ধে সরকার পতনের জন্য ষড়যন্ত্র করছে।
আমি সাগর পাড়ি দিয়েও ওদিকে যাবো না, বাঙালি যাবে না।
দেশবাসীকে কিন্তু উনি ওয়েল ইনফর্ম করেছেন।
দেখেন, আমি একটা কথা বলে রাখি—আমাদের যে দলীয় ব্যর্থতা বা দলীয় দুর্বলতার প্রশ্ন থাকতেই পারে আপনাদের কাছে।
কারণ পৃথিবীতে অনেক জায়গায় আছে ডিপেস্টেট—এ ধরনের কন্সপাইরেসি করেছে।
কোথাও কোথাও সফল হয়েছে, কোথাও কোথাও ব্যর্থ হয়েছে।
আমি আপনাকে বলছি—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেদিন এই তথাকথিত কোটাওয়ালারা অর্থাৎ মূলত শিবির দখল করে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে, সেদিন ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারি নেত্রীকে ফোন করেছেন।
কোট আনকোট করে বললাম—আমি এবং আমি দায়িত্ব নিয়েই বললাম যেটা উনি বলেছেন।
৫০ হাজার লোক নিয়ে আমার গণভবন ঘেরাও করে রাখার ক্ষমতা ছিল না!
আমাদের জমায়েতের শক্তিতে ওরা হারিয়ে যেত।
উনি যদি আমাদেরকে শুধু চোখের ইশারা দিতেন—তাহলে ঢাকা শহরে আমরা পাঁচ থেকে ১০ লক্ষ লোকের জমায়েত করে ফেলতে পারতাম।
আমাদের যে বেজলাইনটা আছে-ফ্রম ঢাকা টু মাওয়া, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট এগুলো তো আমাদের বেজলাইন।
গাজীপুর শক্ত ঘাঁটি, গাজীপুরকে বলা হয় এনাদার গোপালগঞ্জ।
গাজীপুর থেকে এক লক্ষ লোক ঢুকে যেতে পারতো।
ঢাকার বুড়িগঙ্গার পার হলে পরে কেরাণীগঞ্জ।
ঢাকার অদূরেই নারায়ণগঞ্জ আমাদের শক্ত ঘাঁটি।
ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার পথেই শক্ত ঘাঁটি নরসিংদী।
আমরা সব ফাঁক-ফোকরগুলো বন্ধ করে দিয়ে কিন্তু দখল নিতে পারতাম।
সেখানে কিন্তু আরেকটি সম্ভাবনা থাকতো।
সেটা ওদের হাতে অস্ত্রের খবর তো আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে, আমাদের নেত্রীর কাছে ছিল।
প্রশ্ন: কো-ল্যাটারেল ড্যামেজ অনেক বেশি হতে পারতো?
নো, আমি বলছি—আমার এই বয়সেও আমি ছাড়তাম না।
একটা লাঠি নিয়ে হলেও আমি দাঁড়িয়ে যেতাম।
আওয়ামী লীগের শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব না।
Leave a Reply