প্রেমভিত্তিক চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাণ এবং সম্প্রচারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের দাবিতে পাঠানো একটি আইনি নোটিশকে কেন্দ্র করে বিনোদন অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। টেলিভিশন নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাতটি সংগঠন এই নোটিশের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনগুলোর ভাষ্যমতে, রোমান্টিক ঘরানার নাটক বা সিনেমা নির্মাণ সামগ্রিকভাবে বন্ধের দাবি কোনোভাবেই সৃজনশীল শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা মনে করে, এ ধরনের উদ্যোগ শিল্পী, নির্মাতা, প্রযোজক ও কলাকুশলীদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফেলবে।
প্রতিবাদলিপিতে স্বাক্ষর করেছেন ডিরেক্টরস গিল্ডের সভাপতি শহীদুজ্জামান সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক ফরিদুল হাসান, অভিনয়শিল্পী সংঘের সভাপতি আজাদ আবুল কালাম ও সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপু, টেলিভিশন নাট্যকার সংঘের সভাপতি শিহাব শাহীন ও সাধারণ সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন সুমন। এছাড়া ক্যামেরাম্যান অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক সাহিল রনি, অডিও-ভিজ্যুয়াল টেকনিক্যাল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাদেক সিদ্দিকী, টেলিভিশন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরস অর্গানাইজেশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক রাজ্জাক রাজ এবং বাংলাদেশ মেকআপ আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব রহমান মানিকও এতে স্বাক্ষর করেছেন।
সংগঠনগুলোর সম্মিলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অডিও-ভিজ্যুয়াল শিল্প দীর্ঘ সময় ধরে দেশের সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। কোনো নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তি থাকলে তা প্রচলিত আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় সমাধান করার সুযোগ রয়েছে। তবে সৃজনশীল মাধ্যমের একটি নির্দিষ্ট ধারা বন্ধের দাবি শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশের পরিপন্থী। একই সঙ্গে তারা দায়িত্বশীল ও মানসম্মত কনটেন্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও স্বীকার করেছেন।
উল্লেখ্য যে, গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মামুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, তথ্য ও সম্প্রচার সচিব, সংস্কৃতিবিষয়ক সচিব এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর এই আইনি নোটিশটি পাঠান। নোটিশদাতার অভিযোগ, বর্তমান নাটক ও চলচ্চিত্রে প্রেম এবং অতিরিক্ত রোমান্টিক কনটেন্টের আধিক্য সাংস্কৃতিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে। তার দাবি, এসব কনটেন্টে পরকীয়া ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা সমাজের নৈতিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
নোটিশদাতা তার দাবির পক্ষে সংবিধানের ২১(১), ৩৯ ও ২৩ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করেছেন। তার যুক্তি, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও নৈতিকতার স্বার্থে যুক্তিসংগত বাধানিষেধ আরোপের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া ২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নোটিশে যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধ ও পারিবারিক মূল্যবোধ রক্ষায় প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি বিজ্ঞান, শিক্ষা, ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কনটেন্ট নির্মাণের বাধ্যবাধকতা আরোপের দাবি জানানো হয়েছে। নোটিশ পাওয়ার ১০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে অবহিত করতে বলা হয়েছে, অন্যথায় সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট আবেদন করা হবে বলে জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ ধরনের কনটেন্টের সম্প্রচারের সঙ্গে যুবসমাজের পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারের প্রতি অমনোযোগিতা এবং পরকীয়া ও ধর্ষণের মতো অপরাধ বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে বলেও নোটিশে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নাটক, সিনেমা ও অন্যান্য বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রে সৃজনশীল স্বাধীনতা, শিল্পীর মতপ্রকাশের অধিকার এবং প্রচলিত আইন ও নীতিমালা অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু একটি সম্পূর্ণ সৃজনশীল মাধ্যমের একটি নির্দিষ্ট ধারার নির্মাণ বন্ধের উদ্যোগ টেলিভিশনশিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
Leave a Reply