পুরান ঢাকার তাঁতিবাজার এলাকাটি তার নামের মধ্যেই ধারণ করে রেখেছে এক প্রাচীন ইতিহাস। অথচ বর্তমানে সেখানে তাকালে তাঁতযন্ত্রের শব্দের বদলে চোখে পড়ে স্বর্ণের গয়না তৈরির ব্যস্ততা। এই ঐতিহাসিক মহল্লায় পকেটে মাত্র ২৫০ টাকা নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম, উদ্দেশ্য ছিল এখানকার পরিবেশ দেখা এবং অল্প টাকায় বাহারি খাবারের স্বাদ নেওয়া। হাম উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, মোট ১২৭৬। সংসদের বাইরে বিকল্প উদ্যোগ, ‘সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন পরিষদ’ গড়ছে জামায়াত জোট। ২৫০ টাকায় তাঁতিবাজার ঘুরে খাওয়া-দাওয়া। পুরান ঢাকার তাঁতিবাজার মোড়ে দাঁড়িয়ে আমার লক্ষ্য খুব সাধারণ। কারা বাস করছেন এই মহল্লায়, দোকানপাট কেমন, মিষ্টি কতটা মিষ্টি আর এখানকার রসমালাইয়ের স্বাদই বা কেমন। তবে এর আগে যে মহল্লায় এলাম, তার সঙ্গে পরিচয় না থাকলে নিরামিষ খাবারও ঠিকমতো হজম হবে না। তার আমলে বহু সৈনিক ও সাধারণ মানুষ ঢাকায় আসেন। তাই ২৫০ টাকার বাজেটে সেটি নেওয়া সম্ভব নয়।
তাঁতিবাজারের নামকরণের পেছনে রয়েছে মুঘল আমলের ঐতিহ্য। মালয়েশিয়াগামী কর্মীরা কোন ৫১ মেডিকেল সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন, তালিকা প্রকাশ। সেই সঙ্গে হেঁটে দেখব ব্যস্ত এই এলাকা। তারা নিজেদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা গড়ে তোলেন।
সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকে সুবাদার ইসলাম খাঁ চিশতী ঢাকাকে রাজধানী করার পর বিভিন্ন পেশার মানুষকে এখানে বসতি স্থাপনের আহ্বান জানান। তখন থেকেই তাঁতিরা এই এলাকায় মসলিন ও সূক্ষ্ম সুতির কাপড় তৈরির কারিগর হিসেবে পরিচিতি পান। সময়ের আবর্তে উনিশ শতকে মসলিনশিল্পের পতনের পর তাঁতিবাজারসহ সংলগ্ন নবাবপুর ও ইসলামপুরের ব্যবসায়িক ধরনে বড় পরিবর্তন আসে। কোস্টগার্ডের ৫ জাহাজের নাম পরিবর্তন, বাদ পড়ল জয় বাংলাসহ জাতীয় চার নেতার নাম। তাঁতিবাজারের নাম শুনলে প্রথমেই মনে হতে পারে, এখানে নিশ্চয়ই তাঁতিদের বসতি ছিল। ক্রেতারা অনেক সময় সরাসরি তাদের বাড়িতে গিয়ে কাপড় কিনতেন। এভাবেই তাঁতিদের বসতিকে ঘিরে গড়ে ওঠে বাজার। একের পর এক ব্যস্ত স্বর্ণের কারিগর আর মানুষের ভিড় দেখলে বোঝার উপায় নেই, এখানে একসময় কাপড়ও বিক্রি হতো।
স্থাপত্যবিষয়ক গবেষণা ‘লার্নিং ফ্রম পুরান ঢাকা: এক্সপ্লোরিং দ্য ফিউচার অব লিভিং হেরিটেজ’-এ উঠে এসেছে কীভাবে তাঁতিবাজারের ব্যবসা কাপড়ের জগৎ থেকে গয়নার বাজারে রূপান্তরিত হয়েছে। দেশভাগের পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট ও পরিবর্তিত চাহিদা স্থানীয়ভাবে স্বর্ণ ও গয়না তৈরির পেশাকে উৎসাহিত করে। আজ এই এলাকায় ধাতুর গলন, নকশা ও পালিশের কাজ করা কারিগরদের কর্মযজ্ঞই প্রধান দৃশ্য। চারপাশে সারি সারি স্বর্ণের দোকান থাকলেও মহল্লার নাম কিন্তু কাপড়ের কারিগরদের নামে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘লার্নিং ফ্রম পুরান ঢাকা: এক্সপ্লোরিং দ্য ফিউচার অব লিভিং হেরিটেজ’ নামের স্থাপত্যবিষয়ক একটি গবেষণা প্রকল্পের বুকলেটে এ বিষয়ে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। প্রশ্ন জাগে, এই পরিবর্তনটা হলো কবে, কীভাবে। ‘তাঁতিবাজার: আনভেইলিং দ্য মিডাস টাচ’ শিরোনামের ওই গবেষণায় বিভিন্ন দেশের স্থাপত্যের শিক্ষার্থীরা পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ও পরিবর্তিত নগরপরিবেশ নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁতিবাজারের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উঠে এসেছে, কীভাবে স্বর্ণের ব্যবসা ও গয়না তৈরির কারিগরি এলাকার পুরোনো ভবন ও নগরজীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত।
আমার এই ভ্রমণের শুরুতেই চোখে পড়ে একটি পাঁপরভাজার দোকান। মাত্র ১০ টাকা খরচ করে দুই পিসের এক প্যাকেট পাঁপর দিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। এরপর নিরামিষ খাবারের সন্ধানে পৌঁছে যাই ‘অনুরাধা’য়। এখানকার খাবারের তালিকায় থাকা বিভিন্ন পদের বৈচিত্র্য যে কাউকেই মুগ্ধ করবে।
আমার নিরামিষ ভোজের তালিকায় ছিল ১২০ টাকার ধোকা বিরিয়ানি, ৫০ টাকার ছোট ছানার তরকারি, ৪০ টাকার বড়া এবং ২০ টাকার ফুলকপিভাজা। ধোকা বিরিয়ানি এখানকার বেশ আকর্ষণীয় একটি পদ, যেখানে মাংস ছাড়াই বিরিয়ানির স্বাদ নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। চালের বড়া ও ছানার তরকারির সংমিশ্রণ খাবারের স্বাদকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। পোলাও-বিরিয়ানি-তেহারির জন্য নামকরা পুরান ঢাকায় নিরামিষ খাবার কোথায় পাওয়া যায়, দামই বা কত।
অনুরাধার কর্মচারী জয় সরকারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে খাবারের বিশাল আয়োজনও রয়েছে।
তাদের বিশেষ থালিতে ছানার তরকারি, লালশাক, করলা ভাজি, বড়া, কাঁচা কলার তরকারি, ফুলকপি, ধোকা, কচুমুখি, পটলের সর্ষে-পোস্ত, শিম-আলু, ঢেঁড়স, সয়াবিন ও লাউয়ের ডগাসহ হরেক রকম পদ থাকে।
এই থালির দাম ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে।
এছাড়া বড় ছানার তরকারির দাম ১০০ টাকা এবং অন্যান্য পদ ৩০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যেই পাওয়া যায়। সাড়ে তিন ইঞ্চির মতো লম্বা বড় ছানার দাম ১০০ টাকা।
নিরামিষ খাবারের পেটপূজা শেষে ফেরার পথে ১০ টাকায় একটি জিলাপি কিনে নিলাম। এটি ছিল বেশ নরম ও রসালো। সব মিলিয়ে পাঁপরভাজা (১০ টাকা), ধোকা বিরিয়ানি (১২০ টাকা), ছানার তরকারি (৫০ টাকা), বড়া (৪০ টাকা), ফুলকপিভাজা (২০ টাকা) এবং জিলাপি (১০ টাকা)—সব মিলিয়ে ২৫০ টাকায় দারুণ একটি অভিজ্ঞতার সমাপ্তি ঘটল। পাঁপরভাজা খেতে খেতেই ভাবি, এবার একটু নিরামিষ খাবার খুঁজে দেখা যাক।
পুরান ঢাকার অলিগলি মানেই যেন এক জীবন্ত জাদুঘর। এখানে কাবাব বা বিরিয়ানি ছাড়াও যে নিরামিষ খাবারের এত বিশাল ও সুস্বাদু সম্ভার আছে, তা তাঁতিবাজারে না এলে বোঝা কঠিন। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা এই জনপদে নতুন করে আবিষ্কৃত হওয়ার মতো অনেক কিছুই লুকিয়ে আছে।
Leave a Reply