বিশ্বের মনোযোগ যখন ইউক্রেন, গাজা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতের দিকে নিবদ্ধ, তখন এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে আপাতদৃষ্টিতে শান্ত মনে হলেও পর্দার আড়ালে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নীতি এই অঞ্চলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই গত ফেব্রুয়ারিতে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে দাবি করেছিলেন যে, এশিয়াই সম্ভবত একমাত্র অঞ্চল যা সামগ্রিক শান্তি বজায় রাখতে চেষ্টা করে চলেছে। তবে এই শান্তির আড়ালে যুদ্ধবিরোধী আন্তর্জাতিক রীতিনীতির অবক্ষয়, সামরিকায়ন এবং মার্কিন নেতৃত্বের শূন্যতা এক ভয়াবহ বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এশীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান উত্থান পশ্চিমা শক্তিগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে তাইওয়ান ঘিরে চীনের সামরিক তৎপরতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত ডিসেম্বরে তাইওয়ানের চারপাশে চীন তাদের ইতিহাসের বৃহত্তম সামরিক মহড়া পরিচালনা করে। এরপর জানুয়ারিতে পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) একটি মনিটরিং ড্রোন তাইওয়ান-নিয়ন্ত্রিত প্রতাস দ্বীপের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম ঘটনা। ২০২২ সালে তাইওয়ান স্পষ্ট করেছিল যে, এ ধরনের অনুপ্রবেশ ‘প্রথম আঘাত’ হিসেবে বিবেচিত হবে, ফলে এই ঘটনা একটি লালরেখা অতিক্রম করার সমতুল্য।
দক্ষিণ চীন সাগরেও চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। গত মার্চ মাসে স্কারবোরো শোলের প্রবেশপথে চীন ১,১৫০ ফুট দীর্ঘ ভাসমান প্রতিবন্ধক স্থাপন করে ফিলিপাইনের মৎস্যজীবীদের মাছ ধরায় বাধা দেয়। এর আগে সাবিনা শোল ও থিটু দ্বীপের কাছে দুই দেশের নৌযানের মধ্যে বিপজ্জনক সংঘর্ষে এক ফিলিপাইন নাবিক গুরুতর আহত হন। এছাড়া মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ, ভারত-পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়ার মধ্যকার সংঘর্ষ এবং আফগানিস্তান-পাকিস্তানের নিম্ন-স্তরের যুদ্ধ পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলেছে। উত্তর কোরিয়াও এ বছর সাতটি ব্যালিস্টিক মিসাইল পরীক্ষা করেছে এবং ইয়ংবিয়ন কমপ্লেক্সে নতুন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সুবিধা সম্প্রসারণ করেছে বলে আইএইএ নিশ্চিত করেছে।
এই উত্তাল পরিস্থিতিতে এশিয়ার দেশগুলো দ্রুত তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান লক্ষ্য হলো ‘ক্রমবর্ধমান শক্তিবৃদ্ধি যেন দুর্ঘটনায় পরিণত না হয়’। চীন দক্ষিণ চীন সাগরে ‘আক্রমণ না করে অগ্রসর হওয়া’র কৌশলে বিতর্কিত এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। এদিকে, উপসাগরীয় অঞ্চলে মনোযোগ দিতে গিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন উপস্থিতি ও সম্পদ হ্রাস পাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং জাপান থেকে প্রায় ২,৫০০ মেরিন ও জাহাজ সরিয়ে নিয়েছে, যা মিত্র দেশগুলোর আস্থায় চিড় ধরিয়েছে।
পেন্টাগনের ওয়ারগেমিং অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাইওয়ান সংকট মোকাবিলায় মার্কিন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ট্রাম্পের চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা মূলত অর্থনৈতিক হওয়ায় নিরাপত্তা ইস্যুতে মার্কিন মিত্ররা উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে তাইওয়ানের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা মার্কিন-চীন সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার অর্থনৈতিক ধাক্কা এশিয়ার দেশগুলোর ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়া দেশগুলোকে চীন এখন বিভিন্ন তেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়ে নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান ইরান সংঘাতকে এশিয়ার জন্য একটি ‘শুকনো মহড়া’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উপ-পরিচালক হিউং লে থু-র মতে, এশিয়ার এই শান্তি অত্যন্ত ভঙ্গুর। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সম্প্রতি ভিয়েতনাম ও অস্ট্রেলিয়া সফরকালে সতর্ক করে বলেছেন যে, ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণাটি ধীরে ধীরে ক্ষয় পাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং চীন-মার্কিন প্রতিযোগিতার প্রভাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই প্রতিবেদনের আলোকে এশিয়ার প্রকৃত নিরাপত্তা চিত্র বিশ্লেষণ করলে অনেকগুলো নতুন মাত্রা সামনে চলে আসে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলেও অশান্তি লুকিয়ে আছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ছে, যুদ্ধ কৌশল আপডেট হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু একই জল ও আকাশপথে বেশি সামরিক সরঞ্জাম পরিচালনার অর্থ—দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে এবং তার পরিণতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আকস্মিক সংঘর্ষের ঝুঁকি এত বেশি যে, এটি এখন অঞ্চলে সংঘাত প্রতিরোধের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই কৌশলে চীন প্রতিটি পদক্ষেপ এত ছোট করে নেয় যে তাতে প্রতিক্রিয়া আসে না এবং যে প্রতিক্রিয়া আসে না সেটাই নতুন ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মার্কিন নেতৃত্বের সংকট ও চীনের সুযোগ বিদ্যমান এশীয় ভূরাজনৈতিক সমীকরণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আরেকটি উদ্বেগের কারণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যদিও এই পুনর্বিন্যাস কৌশলগতভাবে বড় কিছু না।
Leave a Reply