যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক মধ্যবর্তী নির্বাচনে অভাবনীয় ফলাফল অর্জন করেছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষুব্ধ ভোটারদের সমর্থন তাদের ঝুলিতে এসেছে ঠিকই, কিন্তু জয়ের পরপরই বড় ধরনের এক পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়েছে দলটি। নির্বাচনী সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচ কমানো এখন তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে মূল্যস্ফীতির কবলে পড়ে রিপাবলিকানরা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল, ঠিক সেই একই পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ এখন ডেমোক্রেটদের সামলাতে হবে। ভোটাররা পণ্যের দাম কমুক এমনটিই প্রত্যাশা করছেন, অথচ নীতিনির্ধারকদের হাতে দ্রুত দাম কমিয়ে ফেলার মতো কার্যকর ক্ষমতা খুব একটা নেই। তবে এ প্রক্রিয়া ধীর এবং রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি আকর্ষণীয় নয়। সাধারণত অর্থনীতি নিয়ে মানুষের অসন্তোষের দায় কংগ্রেসের চেয়ে প্রেসিডেন্টকেই বেশি নিতে হয়।
অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী খাদ্য ও জ্বালানির দাম সাময়িকভাবে কমতে পারে, তবে কয়েক বছরের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা পুষিয়ে নিয়ে দাম আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। হুট করে দাম অস্বাভাবিক হারে কমিয়ে আনলে কর্মসংস্থান ও আয়ের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে, যা সাধারণ পরিবারের সংকট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই নতুন ডেমোক্রেট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনসভায় দলটির প্রতিনিধিদের জন্য এটিই হবে প্রথম অগ্নিপরীক্ষা। ভোটারদের বাজেটে সরাসরি প্রভাব ফেলে এমন বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া এখন তাদের সময়ের দাবি। তাদের কেউ কেউ খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথাও বলেছেন। এ ধরনের ব্যাপক মূল্যপতন ঘটলে কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে, মানুষের আয়ও হ্রাস পেতে পারে। ফলে যে স্বস্তি দেয়ার চেষ্টা, শেষ পর্যন্ত তাতে পরিবারগুলো আগের চেয়েও খারাপ অবস্থায় পড়তে পারে। কোন দিকে নজর থাকবে আমেরিকানদের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য পণ্যের দাম আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা জরুরি নয়। কিন্তু গত এক দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, এমন নিশ্চয়তা দেয়া কঠিন।
সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসি প্রায়োরিটিজের ফেডারেল বাজেট নীতির জ্যেষ্ঠ পরিচালক ব্রেন্ডান ডিউক বলেন, মূল্যস্ফীতির বহু প্রভাব মূলত নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে তৈরি হয়েছে, তাই সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে তার কিছুটা পরিবর্তন আনা সম্ভব। তিনি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে কাটছাঁট প্রত্যাহার, স্বাস্থ্যবিমায় ভর্তুকি পুনর্বহাল এবং ইরান যুদ্ধের অবসানের মতো বিষয়গুলোকে ব্যয় কমানোর পথ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে ব্রেন্ডান ডিউকের মতে, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এসব পদক্ষেপে সম্মতি দেবেন কি না তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। এছাড়া বেকারত্ব বৃদ্ধি কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের বিনিয়োগ-বুদ্বুদ ফেটে যাওয়ার মতো অর্থনৈতিক সংকট সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে আড়াল করে দিলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কী বলছেন অর্থনীতিবিদরা সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসি প্রায়োরিটিজের (বাজেট ও নীতি অগ্রাধিকারবিষয়ক গবেষণা সংস্থা) ফেডারেল বাজেট নীতির জ্যেষ্ঠ পরিচালক ব্রেন্ডান ডিউক অ্যাক্সিওসকে বলেন, ‘দাম ২০১৯ সালের পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা সম।
ডেমোক্রেটদের ক্ষমতা সীমিত হওয়ার পেছনে বেশ কিছু রাজনৈতিক ও বাস্তব কারণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তেলের দাম কিছুটা কমলেও, ইরান যুদ্ধ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পের হাতেই থাকছে। ফলে জ্বালানির দাম আরও স্থিতিশীল হবে কি না, তা মূলত তার সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে। এছাড়া কংগ্রেস শুল্ক প্রত্যাহারে সম্মত হলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। আবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুল্ক কমানোর সুবিধা সাধারণ ভোক্তাদের দেবেই—এমন নিশ্চয়তাও নেই। একইভাবে অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের ভর্তুকি বা মেডিকেইডের মতো কর্মসূচিগুলোও ডেমোক্রেটদের অভ্যন্তরীণ মতভেদ কিংবা প্রেসিডেন্টের বাধার মুখে পড়তে পারে। ডেমোক্রেটদের ক্ষমতা সীমিত পারিবারিক ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টিকারী বিভিন্ন কারণ মোকাবিলায় ডেমোক্রেটদের ক্ষমতা সীমিত।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই অনেক ডেমোক্রেট প্রার্থী নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। টেক্সাসের নবনির্বাচিত আইনপ্রণেতা জেমস তালারিকো শুল্ক প্রত্যাহার ও বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যপণ্যের দাম কমানোর কথা বলেছেন। নর্থ ক্যারোলাইনার রয় কুপার ও সাউথ ক্যারোলাইনার অ্যানি অ্যান্ড্রুজ যথাক্রমে সবকিছুর দাম কমানো এবং ফেডারেল গ্যাস কর সাময়িকভাবে স্থগিত করার অঙ্গীকার করেছেন। টেক্সাসের গভর্নর জিনা হিনোজোসা তো সাধারণ মানুষকে ১ হাজার ৫০০ ডলারের রিবেট বা অর্থ ফেরত দেওয়ার চেক প্রদানের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন।
তবে এসব উদ্যোগ নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। ধনকুবের বিনিয়োগকারী জেফ গান্ডলাখ এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেছেন, ডেমোক্রেটদের কাছে এখন সাশ্রয়ী জীবনযাপনের চাবিকাঠি চাওয়া হচ্ছে। তার মতে, জাদুর কাঠি দিয়ে দাম কমানোর পাশাপাশি সরাসরি মানুষকে অর্থ সহায়তা দিলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। সব মিলিয়ে, ডেমোক্রেটরা যদিও কংগ্রেসে বড় সাফল্য পেয়েছে, কিন্তু নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নেই। প্রেসিডেন্টকে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা থেকে বিরত রাখার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতাও তাদের নেই। তারপরও ২০২৮ সালের নির্বাচনে হোয়াইট হাউসে ফিরতে হলে ডেমোক্রেটদের এখন জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতেই হবে।
Leave a Reply