দেশের প্রযুক্তিপ্রেমী শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রংপুর—এই তিনটি বিভাগে একযোগে অনুষ্ঠিত হলো ‘ওয়ার্ল্ড রোবট অলিম্পিয়াড (ডব্লিউআরও) বাংলাদেশ ২০২৬’-এর জাতীয় পর্ব। শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এই আয়োজনে চারটি ভিন্ন শ্রেণিতে প্রায় ৭২টি দলের ২০০-এর বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এবারের প্রতিযোগিতার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘রোবট মিটস কালচার’ বা ‘রোবট মিলছে সংস্কৃতির সঙ্গে’। ফিউচার ইনোভেটরস, রোবোমিশন, রোবোস্পোর্টস ও ফিউচার ইঞ্জিনিয়ার্স—এই চারটি ক্যাটাগরিতে দিনভর বিচারকমণ্ডলী শিক্ষার্থীদের প্রকল্প ও রোবটগুলো মূল্যায়ন করেন।
রাজধানীর ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (ইউআইইউ) অনুষ্ঠিত ঢাকা বিভাগের আয়োজনে ১১০ জন নিবন্ধিত অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৯৭ জন উপস্থিত ছিলেন। এখানে রোবোমিশনে ৪টি, রোবোস্পোর্টসে ৬টি, ফিউচার ইনোভেটরসে ১৭টি এবং ফিউচার ইঞ্জিনিয়ার্সে ৭টি দল অংশ নেয়। আয়োজনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নাসা স্পেস ইনোভেশন ক্যাম্পের সভাপতি আরিফুল হাসান, ইউআইইউয়ের গণসংযোগ পরিচালক আবু সাদাত, বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের সভাপতি মুনির হাসান এবং কুয়েটের মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. হেলাল আল নাহিয়া।
চট্টগ্রাম ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে (সিআইইউ) অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিভাগের প্রতিযোগিতায় ২৬টি দলের ৬৭ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে ফিউচার ইনোভেটরস শ্রেণিতে ২৩টি এবং রোবোমিশন শ্রেণিতে ৩টি দল ছিল। সেখানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিআইইউ স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন অধ্যাপক আসিফ ইকবাল। অন্যদিকে, রংপুর বিভাগের সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে আয়োজিত প্রতিযোগিতায় ফিউচার ইনোভেটরস শ্রেণিতে ১২টি দলের ৩৬ জন শিক্ষার্থী তাদের উদ্ভাবনী প্রকল্প প্রদর্শন করেন।
রংপুরের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের সহসভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাফিফা জামান, সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ খোন্দকার আব্দুল আলিম এবং ডব্লিউআরওর রংপুর অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক এস এম জাহাঙ্গীর আলম। আয়োজকদের মতে, এ ধরনের আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে এটি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করছে।
জাতীয় পর্বের ফলাফলের ভিত্তিতে ঢাকায় একটি বিশেষ দল বাছাই ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হবে। সেখান থেকে চূড়ান্ত বাংলাদেশ দল গঠন করা হবে। এই বিজয়ীরা আগামী ২৫–২৭ সেপ্টেম্বর ভারতে অনুষ্ঠেয় ‘এশিয়া-প্যাসিফিক রিজিওনাল ডব্লিউআরও ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপ’ এবং ৮–১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পুয়ের্তো রিকোতে অনুষ্ঠিতব্য ২২তম ‘ওয়ার্ল্ড রোবট অলিম্পিয়াড’ আন্তর্জাতিক ফাইনালে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে।
প্রতিযোগিতার বিভিন্ন শ্রেণিতে বিজয়ীদের তালিকা বেশ দীর্ঘ। ঢাকা পর্বে ফিউচার ইনোভেটরস শ্রেণিতে স্বর্ণপদক পেয়েছে এলিমেন্টারির ‘কোয়ান্টাম ফিজিকস’ ও সিনিয়রের ‘টিম সিএআরই’। রৌপ্যপদক পেয়েছে এলিমেন্টারির ‘ডব্লিউ হোল কিউব’ এবং জুনিয়র দলের ‘রোবোহোলিকস’ ও ‘তারার বাড়ি’। ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে রোবোম্যানিয়া, মিনিয়ন, স্ক্রু লুজ ক্রু, নম্বর ওয়ান নিশ, এসআইসি অ্যাস্ট্রোবট, রিঅ্যাক্টর ফোর্জ ও ব্লুপ্রিন্ট। এছাড়া রোবো সেপিয়েন্স, আর্কিওএক্সপ্লোরার, সাইবারনেটিক এপেক্স, ভেগা, দ্য এনথুসিয়াস্টস, ওয়্যারড অ্যান্ড টায়ার্ড ও দুর্নিবার দলগুলো সম্মানজনক স্বীকৃতি পেয়েছে।
চট্টগ্রাম পর্বে ফিউচার ইনোভেটরস (সিনিয়র) শ্রেণিতে স্বর্ণপদক পেয়েছে ‘ম্যাভরিক নেক্সাস’। রৌপ্যপদক পেয়েছে এলিমেন্টারির ‘রোবো বাগস’, জুনিয়রের ‘দ্য ইনোভেট্রনস’ ও সিনিয়রের ‘নেবুকোডারস’। ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে জুনিয়র দল ‘ভেগা’। এছাড়া প্রো বয়েজ, ১২ টাকা ওয়ারিয়র্স, রোবো স্টার্টস ও টেকনোভা দলগুলো সম্মানজনক স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
রংপুর পর্বে ফিউচার ইনোভেটরস (সিনিয়র) শ্রেণিতে স্বর্ণপদক পেয়েছে ‘অডিসি এক্স’ এবং রৌপ্যপদক পেয়েছে জুনিয়র দল ‘ডিপ থিংকার্স’। ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সৈয়দপুরের ‘দ্য লেজি ইঞ্জিনিয়ার্স’ এবং ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রংপুরের ‘জেনিথ রোবোটিকস’ দল।
উল্লেখ্য, এই আয়োজনের মূল দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন)। গোল্ড স্পন্সর হিসেবে ব্রেইন স্টেশন ২৩, সিলভার স্পন্সর ক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউট, ক্লাব পার্টনার ইউআইইউ রোবোটিকস ক্লাব এবং নলেজ পার্টনার হিসেবে গ্রে ম্যাটার রোবোটিকস সহায়তা করেছে। এছাড়া ম্যাগাজিন পার্টনার হিসেবে কিশোর আলো ও বিজ্ঞানচিন্তা এবং মিডিয়া পার্টনার হিসেবে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড আয়োজনে যুক্ত ছিল।
সকাল থেকে শুরু হওয়া এই আয়োজনে চারটি শ্রেণিতে সব মিলিয়ে প্রায় ৭২টি দলের ২০০-এর বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেয় এবং দিনভর বিচারকমণ্ডলীর মূল্যায়ন কার্যক্রম চলে।
Leave a Reply