কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাজবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক জেসন আরডে পরলোকগমন করেছেন। ৪১ বছর বয়সি এই শিক্ষাবিদ গত সপ্তাহে তার পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে একাডেমিক চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ তোলা হয়েছিল, যা তিনি বরাবরই অস্বীকার করে আসছিলেন।
শুক্রবার বিকেলে দক্ষিণ লন্ডনের ব্যাটারসি এলাকায় নিজ বাসভবনে অচেতন অবস্থায় তাকে পাওয়া যায়। এর আগে লন্ডন অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের মাধ্যমে পুলিশকে ওই ঠিকানায় ডাকা হয়েছিল। মেট্রোপলিটন পুলিশের ভাষ্যমতে, আরডের মৃত্যু আপাতত অপ্রত্যাশিত হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, তবে এতে কোনো সন্দেহজনক সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
পরিবারের পক্ষ থেকে এক শোকবার্তায় তাকে একজন অসাধারণ বাবা, সঙ্গী ও ভাই হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, ভুল তথ্যের প্রচার ও ক্রমাগত চাপের কারণে জেসন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। তিনি অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন এবং সবসময় সবার মধ্যে ইতিবাচক দিকটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করতেন।
এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল নাথান কোফনাস নামক আরেক শিক্ষাবিদের অভিযোগের মাধ্যমে। নিজেকে ‘রেস রিয়ালিস্ট’ দাবি করা কোফনাসকে ২০২৪ সালে কেমব্রিজ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তিনি আরডের গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ আনেন। যদিও আরডে এসব অভিযোগ নাকচ করেছিলেন, তবে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে তার প্রাথমিক কাজের কিছু ত্রুটি অটিজমের কারণে হয়েছিল, যেখানে তথ্য অনুকরণ বা মিমিক্রির ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল তাকে।
চলতি মাসের শুরুতে দ্য টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরডে জানিয়েছিলেন, তাকে মিথ্যাবাদী ও কল্পনাবিলাসী হিসেবে চিত্রিত করার যে নিষ্ঠুর প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। গত সপ্তাহে পদত্যাগের সময় তিনি বলেছিলেন, তাকে নিয়ে চলা তদন্ত ও সমালোচনার ব্যক্তিগত মূল্য এখন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে, পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে যেন তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বীকৃতি হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করা না হয়। তার ভাষায়, অবিরাম জল্পনা ও জনসমক্ষে করা মন্তব্য তার এবং তার প্রিয়জনদের জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় শুরুতে জানিয়েছিল যে, আরডের থিসিস ও গবেষণাপত্রগুলো লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটি (এলজেএমইউ) এবং সংশ্লিষ্ট জার্নালগুলো তদন্ত করেছে। ২০১৫ সালে তাকে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানকারী এলজেএমইউর তদন্তে চৌর্যবৃত্তির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে চলতি সপ্তাহের শুরুতে কেমব্রিজ কর্তৃপক্ষ তার নিয়োগ নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্তের ঘোষণা দিয়েছিল।
ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডেবোরাহ প্রেন্টিস কর্মীদের চিঠিতে জানিয়েছিলেন, আরডের নিয়োগ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে তা তিনি অনুধাবন করতে পারছেন। এই তদন্তটি কেমব্রিজের অভ্যন্তরীণ ও বাইরের জ্যেষ্ঠ শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে স্বচ্ছভাবে পরিচালনার কথা ছিল।
২০২৩ সালে ৩৭ বছর বয়সে আরডে কেমব্রিজের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপকের হার মাত্র ১ শতাংশ হওয়ায় তার নিয়োগকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল।
তার বন্ধু ও ব্ল্যাক স্টাডিজের অধ্যাপক কেহিন্ডে অ্যান্ড্রুজ নিউজনাইটকে জানিয়েছেন, আরডে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এবং তার মনে হয়েছিল পরিস্থিতির কোনো সমাধান নেই। তিনি প্রায় ঘরবন্দি হয়ে পড়েছিলেন এবং শারীরিকভাবেও অনেক দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন।
লেবার এমপি বেল রিবেইরো-অ্যাডি এই ঘটনাকে নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, একজন শিক্ষাবিদকে যেভাবে সংবাদমাধ্যমের নজরদারি ও সমালোচনার মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক।
গুড ল প্রজেক্টের জোলিয়ন মগাম আরডের মৃত্যুকে মর্মান্তিক আখ্যা দিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, পদত্যাগের পরও তাকে হয়রানি করার পেছনে জনস্বার্থ কোথায় ছিল। শিক্ষামন্ত্রী লুসি পাওয়েলও এই খবরে গভীরভাবে শোকাহত বলে জানিয়েছেন। আরডে তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক হিসেবে এবং পরবর্তীতে ডারহাম ও গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
আরডে আরো বলেন, একইভাবে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলে অন্য শিক্ষাবিদদের কাজেও এ ধরনের ভুল পাওয়া যেতে পারে।
২০১৫ সালে আরডেকে পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়া এলজেএমইউর তদন্তে সিদ্ধান্তে আসা হয়েছিল যে তিনি চৌর্যবৃত্তি করেননি।
তিনি বলেন, তদন্তটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ হওয়া উচিত।
আরডের পরিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই অসাধারণ বাবা, সঙ্গী, ভাই, চাচা/মামা এবং ছেলেকে হারিয়ে আমরা গভীরভাবে মর্মাহত।’
পরিবার আরো বলেছে, ‘ভুল তথ্য ছড়ানোর প্রচারণা জেসনের জন্য খুব বেশি হয়ে গিয়েছিল।
তিনি বলেছিলেন, সমালোচনা একাডেমিক জীবনের অনিবার্য অংশ।
তবে তিনি যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তা একাডেমিক মতবিরোধের সীমা অনেক দূর ছাড়িয়ে গেছে।
তার মৃত্যুর পর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে এখন আরো কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে আরডের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব ও দেখভালের বিষয়টি।
বিশেষ করে তাকে যখন এত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রকাশ্য একটি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
এ নিয়ে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াও দেখা যাচ্ছে।
এক পক্ষ মনে করছে, আরডেকে প্রকাশ্যে অন্যায়ভাবে হয়রানি করা হয়েছিল।
অ্যান্ড্রুজ বলেন, একাডেমিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষাবিদদের পরিস্থিতি আসলে কতটা খারাপ, আরডের ঘটনা সে বিষয়ে একটি সতর্কবার্তা হওয়া উচিত।
একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের প্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের ঝুঁকি মূল্যায়ন করেছিল, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তার মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয়টি এক বিবৃতিতে বলেছে, তাদের সাবেক সহকর্মীর মৃত্যুতে তারা ‘হতবাক ও গভীরভাবে শোকাহত’।
ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ও আরডেকে ‘একজন সদয় ও আন্তরিক মানুষ’ হিসেবে স্মরণ করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি বলেছে, তিনি পিএইচডি শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি ও তা প্রসারে সক্রিয়ভাবে কাজ করতেন।
Leave a Reply