যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের শোচনীয় পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদলের গুঞ্জন চাউর হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন বলে জোর আলোচনা শোনা যাচ্ছিল। তবে হোয়াইট হাউস এবং পররাষ্ট্র দপ্তর যৌথভাবে এসব প্রতিবেদনকে ‘ভুয়া খবর’ বলে কঠোরভাবে নাকচ করেছে। এ পরাজয়ের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইতিহাস গড়লেন যে ১০ প্রার্থী। ট্রাম্পের দলের ঐতিহাসিক ভরাডুবির নেপথ্যে।
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের এই পরাজয়ের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী ইরান যুদ্ধকে দায়ী করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের নেতৃত্বে পরিচালিত এই যুদ্ধের কৌশল নিয়ে প্রবল সমালোচনা রয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে সরানোর দাবিও জোরালো হয়েছে। এর মধ্যেই বিদায়ী এক রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য আগামী সপ্তাহের শুরুতেই হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব আনার ঘোষণা দিয়েছেন। মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় হেগসেথের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরোকে গ্রেপ্তার এবং ইরান যুদ্ধ। আট মাস আগে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধে দিকনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই দুজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি এ উদ্যোগের পেছনে ‘একজন অসন্তুষ্ট, পরাজিত কংগ্রেস সদস্য এবং তাঁর সব ডেমোক্র্যাট মিত্র’ সম্পৃক্ত আছেন বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তাঁর নেতৃত্বে প্রতিরক্ষা বিভাগ কীভাবে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়ন করেছে, তার বিবরণ দিয়েছেন।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের কড়া জবাব দিয়েছেন হেগসেথ। এক ভিডিও বিবৃতিতে তিনি একে ‘ভুয়া অভিশংসন প্রস্তাব’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘তারা আমাদের আক্রমণ করছে কারণ আমরা কার্যকর। তারা আমাকে আক্রমণ করছে, কিন্তু আমরা এতে পিছু হটব না।’ একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তাদের নীতিগুলো ব্যর্থ বলেই তারা এখন রাজনৈতিক নাটক মঞ্চস্থ করে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। একই সঙ্গে অভিশংসনের উদ্যোগের নিন্দা জানিয়েছেন তিনি। তাই ক্ষমতার প্রদর্শনীর আড়ালে রাজনৈতিক নাটক মঞ্চস্থ করার প্রতি তাদের আসক্তি প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার চেষ্টায় ঠেলে দেয়।
হেগসেথ নিজের কাজের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে জানান, তাঁর নেতৃত্বেই সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ প্রক্রিয়া গতি পেয়েছে, প্রতিরক্ষাশিল্পের ভিত্তি পুনরায় শক্তিশালী হয়েছে এবং বিভিন্ন বৈচিত্র্যবিষয়ক বিতর্কিত উদ্যোগ বন্ধ করা হয়েছে। ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করলেও, ট্রাম্প নিজে হেগসেথের কাজের প্রশংসা করেছেন। এবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি হেগসেথকে ‘অসাধারণ’ বলে আখ্যায়িত করে তাঁকে দায়িত্বে বহাল রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এ সময় হেগসেথের কয়েকটি সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
অন্যদিকে, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়াইয়ের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পদ ছাড়ছেন—এমন খবরও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রুবিও স্পষ্ট করেছেন যে, ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে কাজ করাই ছিল তাঁর মূল পরিকল্পনা। বিনা রক্তপাতে যুক্তরাষ্ট্রে ‘রেজিম চেঞ্জ’।
নিজের চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুঞ্জনকে উড়িয়ে দিয়ে রুবিও রসিকতা করে বলেন, ‘আমি যে কাজ করছি তা ভালোবাসি, আর যখন তারা বলে আমি চাকরি ছেড়ে দেব, আমি তখন হাসি। আমি জিজ্ঞেস করি, কোন চাকরিটা?’
এদিকে ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের কৌশলগত দিকনির্দেশনার জন্য দায়ী জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন অথবা সেন্টকমের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারকে সরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে হেগসেথের বিষয়টি বর্তমানে বেশি উত্তপ্ত। রিপাবলিকান প্রতিনিধি টমাস ম্যাসি তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে পোস্ট দিয়ে বলেছেন, নতুন ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ট্রাম্পের উচিত হেগসেথকে সরিয়ে দেওয়া। ম্যাসি লিখেছেন, ‘সিনেটে উত্তরসূরিদের নিয়োগ নিশ্চিত করার সুযোগ থাকা অবস্থাতেই তাঁর (ট্রাম্পের) এটি করা উচিত।’।
যদিও হেগসেথের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না, এমনকি তিনি টেনেসি অঙ্গরাজ্যের একটি শূন্য সিনেট আসনে নির্বাচন করতে আগ্রহী বলেও গুঞ্জন রয়েছে। তবে বর্তমান প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সংকটের মুহূর্তে ডেমোক্র্যাটদের হাতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ আসায় ট্রাম্পের জন্য তাঁর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
Leave a Reply