প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সীতাকুণ্ডে পাহাড়, ঝরনা ও সমুদ্রের টানে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়লেও রেলসেবার অব্যবস্থাপনা পর্যটকদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি ছুটির দিনগুলোতে যাত্রীচাপ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেলেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত কোচ বা বিশেষ ট্রেনের কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ফলে ট্রেনের ভেতরে জায়গা না পেয়ে অনেক যাত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। স্থানীয়দের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে ছাদযাত্রা বন্ধ করা সম্ভব নয়, বরং রেলের পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোই এখন সময়ের দাবি।
রেলযাত্রীদের আরেকটি বড় উদ্বেগের নাম কুমিরা স্টেশন। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের বেশ কয়েকটি মেইল ট্রেন গভীর রাতে এই স্টেশনে পৌঁছায়। পরিবার ও শিশু নিয়ে গভীর রাতে স্টেশনে নামার পর সীতাকুণ্ডের গন্তব্যে যাওয়ার পর্যাপ্ত যানবাহন না পাওয়ায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দা ইলিয়াস ভুঁইয়া জানান, সীতাকুণ্ড রেলস্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের নিয়মিত যাত্রাবিরতি থাকলে পর্যটক ও সাধারণ যাত্রীদের এই দুর্ভোগ অনেকাংশেই লাঘব হতো। কুমিরা স্টেশনটি মূল এলাকা থেকে দূরে হওয়ায় গভীর রাতে সেখানে নামাটা যাত্রীদের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
কুমিরা রেলস্টেশন মাস্টার আশরাফ জানান, রাত তিনটার দিকে ট্রেন থামলে স্টেশন এলাকায় বখাটে ও মাদকসেবীদের উৎপাত বেড়ে যায়। স্টেশনটি চারদিক থেকে উন্মুক্ত এবং সেখানে স্থায়ী জিআরপি পুলিশের কোনো উপস্থিতি নেই। তিনি জানান, সম্প্রতি এক যাত্রীর কাছ থেকে দেড় হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া ট্রেনের ভেতরে থাকা অ্যাটেনডেন্টদের বিরুদ্ধে বিনা টিকিটের যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না পড়ায় রেলওয়ে রাজস্ব হারাচ্ছে এবং ট্রেনের ভেতরে টাকা দেওয়ার পর স্টেশনে পুনরায় অর্থ দাবি করায় যাত্রীরা রেলকর্মীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ছেন।
সীতাকুণ্ড রেলস্টেশন মাস্টার নিজাম উদ্দিন জানান, একটি অসাধু চক্র টিকিটবিহীন যাত্রীদের টার্গেট করে স্টেশন মাস্টার ও রেল কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় করছে। তিনি স্পষ্ট করেছেন, টিকিট ছাড়া ভ্রমণ করলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কিন্তু কর্মকর্তা পরিচয়ে বেআইনিভাবে অর্থ আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। রেলওয়ে পুলিশের এসআই দীপক দেওয়ান জানিয়েছেন, বিনা টিকিটে ভ্রমণ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তবে জোর করে টাকা আদায় বা ভয়ভীতি দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
পর্যটকদের পদচারণায় সীতাকুণ্ডের হোটেল-রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় ব্যবসায়িক খাতে গতি ফিরলেও রেলসেবার দুর্বলতা এই সম্ভাবনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ছুটির দিনে অতিরিক্ত কোচ ও বিশেষ ট্রেন চালু করার পাশাপাশি সীতাকুণ্ডে আন্তঃনগর ট্রেনের নিয়মিত স্টপেজ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া মেইল ট্রেনের সময়নিষ্ঠতা বজায় রাখা, ছাদযাত্রা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, কুমিরা ও সীতাকুণ্ড স্টেশনে রাতের নিরাপত্তা জোরদার এবং জিআরপি পুলিশের টহল বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। একইসঙ্গে কর্মকর্তা পরিচয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।
ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বুধবার সকালে চট্টগ্রামমুখী ঢাকা মেইল সীতাকুণ্ড স্টেশনে পৌঁছালে কামরার পাশাপাশি ছাদ থেকেও দলে দলে যাত্রী নামতে দেখা যায়। মুহূর্তেই স্টেশন চত্বর পর্যটকদের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে। পরে তারা সিএনজি অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনে চড়ে চন্দ্রনাথ পাহাড়, গুলিয়াখালী, মহামায়া ও ইকোপার্কের মতো দর্শনীয় স্থানগুলোতে ছুটে যান। পর্যটন নগরী হিসেবে সীতাকুণ্ডের গুরুত্ব বাড়লেও রেল যোগাযোগে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের ভোগান্তি কমার কোনো লক্ষণ নেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাহাড়, ঝরনা, সাগর ও সবুজের টানে সীতাকুণ্ডে পর্যটকের ঢল নামলেও সেই চাপ সামাল দিতে পারছে না রেলওয়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্যবসায়ীদের মতে, নিরাপদ ও সহজ রেল যোগাযোগ নিশ্চিত করা গেলে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এতে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
Leave a Reply