1. admin@deshibanglatv.com : dbtvlipu :
  2. deshibanglatv@gmail.com : dtvbangla :
  3. deshibanglatv0@gmail.com : newsdesk :
November 6, 2026, 5:01 am

স্মিতা পাতিল: প্রথা ভাঙা এক জীবনের অকাল প্রস্থান

প্রতিবেদকঃ
  • হালনাগাদ সময়ঃ Saturday, October 17, 2026
  • 42 দেখা হয়েছে

১৯৫৫ সালের ১৭ অক্টোবর ভারতের পুনেতে স্মিতা পাতিলের জন্ম। তাঁর বাবা শিবাজিরাও গিরধর পাতিল ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ এবং মা বিদ্যাতাই পাতিল ছিলেন সমাজসেবী। বাবা-মায়ের কর্মময় ও সামাজিক জীবনের প্রভাব তাঁর ব্যক্তিত্বের ওপর পড়েছিল গভীরভাবেই। পুনে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী স্মিতা কর্মজীবনের শুরুতে মুম্বাই দূরদর্শনের সংবাদপাঠিকা হিসেবে কাজ করেছিলেন। পরিচালক শ্যাম বেনেগালের হাত ধরে সিনেমায় আসা এই অভিনেত্রী প্রথাগত গ্ল্যামারনির্ভর নায়িকার সংজ্ঞাকে শুরুতেই নস্যাৎ করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, নারীর চরিত্র কেবল ভুক্তভোগী হিসেবে দেখানো উচিত নয়, বরং তাদের ভেতরের অদম্য শক্তিকেও ফুটিয়ে তোলা প্রয়োজন। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রভাব পূর্ণমাত্রায় পড়ত অভিনয়েও। সেই অধ্যায় দীর্ঘ হয় অন্যান্য যশস্বী পরিচালকের নির্দেশনায়। কিন্তু ভালো পরিচালক পাওয়া কঠিন, তাঁরা প্রায়ই নতুন মুখকে প্রাধান্য দেন।

১৯৭৪ সালে ‘মেরে সাথ চল’ ছবি দিয়ে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু হলেও, শ্যাম বেনেগালের ‘নিশান্ত’ দিয়ে তিনি দর্শকের নজর কাড়েন। এরপর ‘মন্থন’, ‘ভূমিকা’, ‘আক্রোশ’, ‘চক্র’, ‘সদগতি’, ‘অর্থ’, ‘দেবশিশু’, ‘চিদম্বরম’, ‘গুলামি’, ‘বাজার’, ‘আকালের সন্ধানে’, ‘মান্ডি’, ‘অর্ধসত্য’ ও ‘মির্চ মশলা’র মতো কালজয়ী সব ছবিতে অভিনয় করে ভারতীয় সিনেমায় নিজের অবস্থান শক্ত করেন। শ্যাম বেনেগাল এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছিলেন, ক্যামেরার সামনে স্মিতা ছিলেন অত্যন্ত সাবলীল ও বহুমাত্রিক। ‘মন্থন’ ছবির সময় চরিত্রের প্রয়োজনে কুঁড়েঘরে থাকা, ঘুঁটে দেওয়া বা দুধ দোহানোর মতো কাজগুলো তিনি নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করেছিলেন। কিন্তু হিন্দি ছবিতে একটাতেই থামা যায় না। পরিবর্তে খবরটি পৌঁছে দিতে পাঠিয়েছিলেন শশী কাপুরকে। খুব সহজেই যেকোনো চরিত্রের অংশ হয়ে যেতে পারতেন। মন্থনের শুটিংয়ের সময় কুঁড়েঘরে থেকে ঘুঁটে দেওয়া, গরুর দুধ দোয়ানো, বালতিতে জল তোলা… সবকিছুই শিখেছিলেন।

সমান্তরাল ধারার পাশাপাশি বাণিজ্যিক সিনেমায় কাজ করার অভিজ্ঞতাও ছিল তাঁর। তবে এই জগত নিয়ে তাঁর নিজস্ব আপত্তি ছিল। তিনি মনে করতেন, বাণিজ্যিক ছবিতে নারীদের শরীরকে প্রলোভনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা তাঁর সংস্কৃতির বাইরে। অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে ‘নমক হালাল’ ছবির জনপ্রিয় বৃষ্টির গান ‘আজ রাপাত যায়ে তো’ শুটিংয়ের সময় তিনি ভীষণ অস্বস্তিতে ছিলেন। অমিতাভ পরবর্তীকালে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, স্মিতা পুরো শুটিংজুড়ে বিষয়টি নিয়ে দ্বিধাবোধ করেছিলেন, কারণ এমন দৃশ্যায়নের সঙ্গে তিনি মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। এমনকি এয়ারপোর্টে কেউ যখন তাঁকে ওই ছবির জন্য চিনতেন, তখন তিনি লজ্জা পেতেন। তাঁর অভিনীত ছবিগুলো ছিল প্রথাগত নায়কপ্রধান ছবির বিপরীত মেরুর। নায়িকা হতে হলেই গায়ের রং হবে ফর্সা—এমন ধারণাকে ভেঙে দিয়েছিলেন স্মিতা। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বরাবর সরব হয়েছেন নারীদের সমস্যা ও অধিকার নিয়ে। ২০১৫ সালে স্মিতা পাতিলকে নিয়ে একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে অমিতাভ স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘ও বলেছিল, এই গানটা তার সংস্কৃতি ও চিন্তার বাইরে। আমি ভাবছি, শাবানা (আজমি) পারবে কি না ওই বৃত্ত থেকে বের হতে—আমার মনে হয়, সে এখন অনেক ভেতরে ঢুকে গেছে। তাঁর স্পষ্ট মন্তব্য, ‘আমি ভালো ছবিতেই কাজ করতে চাই। কারণ, তাকে যা করতে বলা হচ্ছিল, সে তা বুঝে উঠতে পারছিল না।’। একবার এয়ারপোর্টে কেউ ওকে “নমক হালালের” জন্য চিনে ফেললে সে নাকি লজ্জা পেত। তাই আমি চাই, আমরা নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করি, যাতে মানুষ চরিত্রটাকে দেখে, শরীরকে নয়।’। যেমন ‘মন্থনে’ কত সহজে বিন্দুর চরিত্রে নিজেকে বসিয়ে দিয়েছিলেন।

স্মিতা পাতিলের ব্যক্তিগত জীবনেও ছিল বেশ কিছু টানাপোড়েন। তিনি নিজের সম্পর্কগুলো কখনো আড়াল করেননি, যা তাঁকে ইন্ডাস্ট্রির আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল। অভিনেতা রাজ বব্বরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আলোচিত। তাঁর বোন মান্য পাতিল এক সাক্ষাৎকারে জানান, সম্পর্কের টানাপোড়েনে স্মিতা বেশ নিঃসঙ্গ ছিলেন এবং পরিবার ভাঙার অপরাধবোধও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াত। অভিনয়ের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন আপসহীন। মান্য পাতিল জানান, একবার এক দৃশ্যে ‘ম্যায় তোমহারে বাচ্চে কি মা বাননে ওয়ালি হুঁ’—সংলাপটি বলতে বলা হলে তিনি তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন এবং সংলাপ বদলে ‘ম্যায় মা বাননে ওয়ালি হুঁ’ করতে বাধ্য করেছিলেন।

পরিচালক যশ চোপড়ার সঙ্গেও একটি তিক্ত স্মৃতির কথা শোনা যায়। শাহরুখ খানের সঙ্গে কথোপকথনে যশ চোপড়া স্বীকার করেছিলেন, তিনি স্মিতাকে না জানিয়েই শুটিংয়ের একদিন আগে তাঁকে একটি প্রজেক্ট থেকে বাদ দিয়েছিলেন। পরে মুখোমুখি হলে স্মিতা সরাসরি জানিয়েছিলেন, যশ চোপড়ার সিদ্ধান্তের চেয়েও তাঁর অবজ্ঞার বিষয়টিই তাঁকে বেশি কষ্ট দিয়েছে। যশ চোপড়া সে সময় লজ্জিত হয়ে নিজের ভুল স্বীকার করেছিলেন। পরে মুখোমুখি হলে স্মিতা বলেন, ‘যশজি, আপনি যা করেছেন, নিশ্চয়ই ভেবেচিন্তেই করেছেন। আপনি নিজে জানালে আমি কষ্ট পেতাম না, কিন্তু শশী এসে বলেছে, সেটাই আমাকে আঘাত দিয়েছে। ভালবাসতেন গাড়ি চালাতে, ভলিবল খেলতে।

স্মিতার জীবনের শেষ সময়টি ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ১৯৮৬ সালের ২৮ নভেম্বর রাজ ও স্মিতার একমাত্র সন্তান প্রতীকের জন্ম হয়। তবে সন্তান জন্মের পরপরই তিনি শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েন। ১৩ ডিসেম্বর তাঁর তীব্র জ্বর আসে এবং তিনি শিশুকে কোলে নেওয়ার মতো শক্তিও হারিয়ে ফেলেছিলেন। ওই দিনই সন্ধ্যার দিকে খিঁচুনি ও রক্তবমির পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে তিনি কোমায় চলে যান। মাত্র দুই সপ্তাহ বয়সী শিশুপুত্রকে রেখে ১৯৮৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর মাত্র ৩১ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী।

মাত্র এক দশকের সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ারে স্মিতা পাতিল যা রেখে গেছেন, তা ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অমলিন। অভিনয়ের পাশাপাশি ফটোগ্রাফি, গাড়ি চালানো কিংবা ভলিবলের মতো শখেও ছিলেন তিনি সমান আগ্রহী। প্রথাগত বাণিজ্যিক ধারার বাইরে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে তিনি শিখিয়ে গেছেন যে, একজন অভিনয়শিল্পীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাঁর নীতি ও আদর্শের প্রতি অবিচল থাকা।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© ২০২৬ দেশি বাংলা টিভি — সর্বসত্ব সংরক্ষিত
Developer By Zorex Zira