ভূমধ্যসাগরে খাবার ও পানি ছাড়া প্রায় ১১ দিন ভেসে থাকার পর গ্রিসগামী একটি রাবারের নৌকায় অন্তত ১১ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নয়জন বাংলাদেশি বলে জানিয়েছেন বেঁচে যাওয়া সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুল করিম। এই ভয়াবহ ঘটনায় শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাঁচ যুবকের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না, যা তাদের পরিবারকে চরম উৎকণ্ঠায় ফেলেছে। মিশরে চিকিৎসাধীন আব্দুল করিমের বরাতে কায়রোতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (শ্রম) মো. জাকির হোসেন গণমাধ্যমকে এই মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গত ৩ আগস্ট লিবিয়া থেকে ৪২ জন যাত্রী নিয়ে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল নৌকাটি। যাত্রাপথে কিছুদূর যাওয়ার পরই নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায় এবং জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। এরপর প্রায় ১১ দিন ভূমধ্যসাগরের উত্তাল জলরাশির ওপর ভাসতে থাকার পর গত ১৩ আগস্ট মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে নৌকাটি পৌঁছায়। আবদুল করিমের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, নৌকাটিতে ৩৮ জন বাংলাদেশি ও চারজন সুদানের নাগরিক ছিলেন। দীর্ঘ সময় খাবার ও পানি ছাড়া সাগরে আটকা থাকার কারণে প্রচণ্ড গরম ও পানিশূন্যতায় ১১ জন মারা যান। বেঁচে থাকা যাত্রীরা বাধ্য হয়ে তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে আবদুল করিম বর্ণনা করেছেন যে, নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা আর এগোতে পারেননি। নৌকায় পর্যাপ্ত খাবার ও পানি ছিল না। তার চোখের সামনেই নয়জন বাংলাদেশি মারা যান এবং পরবর্তীতে আরও দুজনের মৃত্যু হয়। দীর্ঘ সময় সাগরে থাকার কারণে বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের শারীরিক অবস্থাও অত্যন্ত গুরুতর হয়ে পড়েছে। লবণাক্ত পানিতে দীর্ঘ সময় থাকার ফলে তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ পচতে শুরু করেছে এবং দুর্গন্ধ বের হচ্ছে বলেও জানান করিম। তিনি আরও জানান, রাবারের নৌকাটিতে সর্বোচ্চ ২৫ জন যাত্রী বহনের সক্ষমতা থাকলেও এতে ৪২ জনকে তোলা হয়েছিল এবং নৌকাটিতে ছিল মাত্র একটি ইঞ্জিন। জাকির হোসেন জানান, মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে স্থানীয় লোকজন নৌকাটি দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পরবর্তীতে প্রায় ২৯ থেকে ৩০ জনকে উদ্ধার করা হয়, যাদের অনেকেই অচেতন ছিলেন এবং তাদের দুটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়।
এদিকে শান্তিগঞ্জের স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, নিখোঁজ পাঁচ যুবকের মধ্যে রয়েছেন পাগলা শত্রুমর্দান গ্রামের হৃদয় পাল, চিকরকান্দি গ্রামের এনামুল খান, রিপন মিয়া ও মামুন খান এবং রানসি গ্রামের মো. তালহা। নিখোঁজ হৃদয় পালের চাচা কানন পাল জানান, গত ৩১ জুলাই সর্বশেষ হৃদয়ের সঙ্গে তার কথা হয়। তখন হৃদয় জানিয়েছিলেন, ৩ আগস্ট তিনি গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। কানন পাল আরও জানান, ওই দিন দুটি নৌকা ছেড়ে গিয়েছিল। পরে প্রথম নৌকার একজন যাত্রী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান যে, হৃদয় দ্বিতীয় নৌকায় ছিলেন। এরপর থেকে পরিবারের সদস্যরা তার কোনো সন্ধান পাননি।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার বলেন, এ ধরনের কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে নেই এবং তাদের পরিবার থেকেও বিষয়টি আমাদের অবগত করা হয়নি। তবে ভিডিও ফুটেজের বক্তব্যটি সঠিক কিনা, তা আমরা খতিয়ে দেখব। উল্লেখ্য, এর আগে গত মার্চ মাসেও লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করা একটি নৌকায় অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছিল, যার মধ্যে ১২ জনই ছিলেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। এই ঘটনাটি আবারও অবৈধ পথে ইউরোপ যাত্রার ঝুঁকি ও ভয়াবহতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
Leave a Reply