তেলাপোকা জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে শুক্রবার তার নিজ বাসভবন থেকে আটক করেছে পুলিশ। রাজধানীতে প্রস্তাবিত ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ বা তেরঙ্গা ওড়াও মিছিলে যোগ দেওয়ার ঠিক মুহূর্তের আগে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে এটি দীপকের দ্বিতীয়বার আটকের ঘটনা। এর আগে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি নিজের গ্রেপ্তার হওয়ার শঙ্কার কথা জানিয়ে কারাবাসের প্রস্তুতি রয়েছে বলেও উল্লেখ করেছিলেন। এরও আগে গত শনিবার মুম্বাই থেকে বিমানযোগে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর তাকে আটক করা হয়েছিল। এছাড়া মান্ডি হাউসের কাছ থেকে বিক্ষোভ প্রদর্শনের সময় আইসা নেত্রী নেহা বোরাসহ আরও বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারীকে পুলিশ আটক করে। বিরোধী ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতারা এবং সিজেপির পক্ষ থেকে ভোটার তালিকার এসআইআর প্রক্রিয়ায় কারচুপির অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানানো হচ্ছিল।
ঘটনার দিন দুপুরে কোনো ধরনের ‘তিরঙ্গা যাত্রা’ না করার বার্তা নিয়ে অভিজিৎ দীপকের নয়াদিল্লির বাড়িতে উপস্থিত হয় দিল্লি পুলিশ। ওই সময় ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কাঁধে ছোট একটি জাতীয় পতাকা জড়িয়ে সোফায় বসা দীপক সামনে বসা পুলিশকর্মীকে প্রশ্ন করছেন, তার বিরুদ্ধে কী ধরনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। এ সময় তাকে যে নোটিশ দেওয়া হয় তাতে উল্লেখ ছিল যে, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বেআইনিভাবে উসকানি দিয়ে আসছেন। এসব বিষয়কে মশকরা উল্লেখ করে দীপক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন, তার কোনো সহিংস উসকানির ভিডিও থাকলে তা যেন দেখানো হয়। এমনকি পুলিশকে কটাক্ষ করে তাকে ফাঁসি দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। বাড়িতে উপস্থিত অন্যান্য পুলিশ সদস্যরা যখন ভিডিও ধারণ করছিলেন, তখন দীপক এই চ্যালেঞ্জ জানান। পুলিশ তাকে জানায় যে, জাতীয় পতাকা বহন করা অপরাধ না হলেও অনুমতি ছাড়া জমায়েত বা মিছিল করা বিধিমালার লঙ্ঘন এবং এর জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এছাড়া জাতীয় পতাকা বিধি বা ফ্ল্যাগ কোড মেনে সম্মান প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতার বিষয়েও তাকে সতর্ক করা হয়। দীপকে তাকে দেওয়া নোটিশটি পড়ে শোনান, যার একটি অভিযোগে বলা হয়েছে, “আপনি (দীপকে) সোশ্যাল মিডিয়ায় সাধারণ মানুষকে উসকানি দিয়ে আসছিলেন, যা বেআইনি। পুলিশকে উদ্দেশ্য করে দীপকে বলেছেন, “বরং আমাকে ফাঁসিই দিয়ে দিন না।
সিজেপির এই কর্মসূচি প্রতিহত করতে কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্ক এলাকা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে প্রশাসন। দিল্লি পুলিশ জানায়, ব্যস্ততম এই বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং যন্তর মন্তরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এলাকা ও এর আশপাশে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করে ১১ জনের বেশি জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদের মতে, রাজধানীতে নতুন করে আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যেই সেন্ট্রাল পার্কে প্রবেশাধিকার দুদিনের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর আগে সিজেপির দুই নেতাকে যন্তর মন্তরে তেরঙ্গা উত্তোলনের দায়ে পাঁচ দিনের জন্য তিহাড় জেলে পাঠানোর প্রতিবাদে শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় সেন্ট্রাল পার্কে জমায়েত হয়ে তেরঙ্গা ওড়ানোর ডাক দিয়েছিল তেলাপোকা জনতা পার্টি, বামপন্থী ছাত্র-যুব সংগঠন এবং আম আদমি পার্টি। এই কর্মসূচির প্রতি কংগ্রেসও সমর্থন জানিয়েছিল। তবে নিউ দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল বা এনডিএমসি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায় যে, প্রশাসনিক কারণে ১৬ ও ১৭ অক্টোবর সেন্ট্রাল পার্ক সাধারণের জন্য বন্ধ থাকবে এবং সেই অনুযায়ী পুলিশকে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এবং যন্তর মন্তরের পথে থাকা অন্যতম প্রধান ব্যবসার কেন্দ্র ‘কনট প্লেস’ ও এর আশপাশের এলাকায় ‘ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা’ (-এর ১৬৩ ধারার অধীনে ১১ জনের বেশি জমাযেতে একটি নি।
শুক্রবার কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে সিজেপির পূর্বঘোষিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুরো দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তা ও উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ছয় হাজারের বেশি পুলিশ কর্মী, সেন্ট্রাল আর্মড পুলিশ ফোর্সের বা সিএপিএফের ২২০ কোম্পানি এবং বর্ধিত সিসিটিভি নেটওয়ার্ক সক্রিয় করা হয়। দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে আগেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে প্রস্তাবিত এই কর্মসূচির আগে তাকে আটক করা হতে পারে এবং তদন্তকারীরা তার ওপর নজরদারি চালাচ্ছেন। এদিকে কনট প্লেসে সিজেপির বিক্ষোভ কর্মসূচি বন্ধের আবেদন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলেও আদালত কোনো জরুরি নির্দেশ দিতে রাজি হয়নি। উৎসবের মৌসুমে ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক ক্ষতির আশঙ্কার কথা বিবেচনা করে আদালত মন্তব্য করে যে, তারা আশা করে শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীরা যেন সাধারণ মানুষের চলাচল ও ভোগান্তিহীন পরিবেশ নিশ্চিত করে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে ৬,০০০-এরও বেশি দিল্লি পুলিশ কর্মী, সেন্ট্রাল আর্মড পুলিশ ফোর্সের (সিএপিএফ) ২২০টি কোম্পানি এবং একটি বর্ধিত সিসিটিভি নেটওয়ার্ক মোতায়েন করা হয়েছে। আদালতের বেঞ্চ বলেছে, “আমরা আশা করি শুভবুদ্ধির উদয় হবে।
সংবাদ সংস্থা পিটিআই সূত্রে জানা যায়, দিল্লির এই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় কনট প্লেস, রাজীব চক, সেন্ট্রাল পার্ক, যন্তর মন্তর, পালিকা বাজার, সংলগ্ন মেট্রো স্টেশন ও লুটিয়েন্স দিল্লির সংবেদনশীল পয়েন্টগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নির্ধারিত মিছিল শুরুর আগে বিভিন্ন জেলা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনীও মোতায়েন করা হয়। আন্দোলন মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়ে সিজেপি আগেই জানিয়েছিল যে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে তাদের একটি বিকল্প পরিকল্পনা বা ‘প্ল্যান বি’ প্রস্তুত রয়েছে।
Leave a Reply