অবশেষে ফাঁস হলো পুলিশ হাউজিংয়ে বাড়ি তৈরি করে সেখানে নারী, মদ ও জুয়ার আসর বসিয়ে টাকা উপার্জনে জড়িত এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিতর্কিত পতিত স্বৈরাচারের দোসর অ্যাডিশনাল ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের সকল কুকীর্তি। পুলিশ সদরদপ্তরের রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখায় কর্মরত অ্যাডিশনাল ডিআইজি (সুপারনিউমারারি) আব্দুল্লাহ আল জহিরকে সদর দপ্তরের হেডকোয়ার্টার্স শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ-সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়। আইজিপি আলী হোসেন ফকির স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আব্দুল্লাহ আল জহিরকে হেডকোয়ার্টার্স শাখায় সংযুক্ত করা হলো। আদেশে আরও বলা হয়, এ সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে।
এর আগে গত সোমবার রাজধানীর ভাটারা থানাধীন পুলিশ হাউজিং-১ এলাকায় জহিরের বাড়িতে অভিযান চালায় ডিবির গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের একটি দল। অভিযানে মাদকদ্রব্য উদ্ধারসহ নারী ও পুরুষ মিলিয়ে মোট ৮৪ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ২৬ জন নারী ও ৫৮ জন পুরুষ এবং একজন আফগানিস্তানের নাগরিকও আছেন। সোমবার রাত থেকে শুরু হওয়া এই অভিযান মঙ্গলবার বিকেলে শেষ হয়। মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম। ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, ওই পুলিশ কর্মকর্তা বাড়িটি ভাড়া দিয়েছেন। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ও অবৈধ ডিজে পার্টি চলছিল। এসব পার্টির জন্য তারা অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিতেন। ডিবির একটি সূত্র জানায়, বাসাটিতে ডিজে পার্টির নামে মাদকের আসর বসত। এসব পার্টিতে তরুণ-তরুণী ছাড়াও বিভিন্ন বয়সী মানুষ অংশ নিতেন। অভিযান চালিয়ে ওই বাড়ি থেকে গাঁজা, ইয়াবা, মদ ও কনডম জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া ইয়াবা সেবনের সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়েছে। গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের ডিসি ইলিয়াস কবির জানান, এয়ারবিএনবির মাধ্যমে বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। একজন হোস্ট ও একজন কো-হোস্টের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হচ্ছিল। কো-হোস্ট মাহবুবুল আলমকে আটক করা হয়েছে। ডিবি পুলিশের একটি সূত্র জানায়, অ্যাডিশনাল ডিআইজি আটক কো-হোস্টকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তদবিরও করেছিলেন। অদ্যাবধি উক্ত টাকার বিনিময়ে ১ বিঘা জমিও ক্রয় করা হয়নি।
অ্যাডিশনাল ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির অতিরিক্ত আইজি এডমিন মোখলেছুর রহমানের স্টাফ অফিসার হিসেবে ৪ বছর কর্মরত ছিলেন। মোখলেছুর রহমান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহের ছাত্রলীগের সভাপতি ও পুলিশে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের অন্যতম নেতা ছিলেন। তার স্টাফ অফিসার থাকাকালে জহির বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা বাগিয়ে নেন। পুলিশের আরেক বিতর্কিত কর্মকর্তা প্রলয় জোয়ারদারের সাথে মিলে ‘রিমঝিম পুলিশ টাউন’ নামে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলেন তিনি। এ সময় ২৪ বিসিএসের কর্মকর্তাদের জোরপূর্বক এ প্রকল্পের প্লট কিনতে বাধ্য করা হয়। যারা প্লট কিনতে অস্বীকার করেছেন, তাদের পদোন্নতি আটকে দেওয়া হয়। রিমঝিম পুলিশ টাউনের মূল হোতা প্রলয় জোয়ারদার ও জহির। অলিউর রহমান নামে জহিরের বন্ধুকে দিয়ে কোম্পানি গঠন করে এ আবাসন প্রকল্প চালানো হয়। জোরপূর্বক জমি দখল, ফসলী জমি না কিনেই বালু দিয়ে দখল এবং কম মূল্যে জমি বিক্রিতে বাধ্য করার হাজার হাজার অভিযোগ রয়েছে এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে। গাজীর গোলাম দস্তগীরের পিএস এমদাদ ছিল প্রলয়-জহির গংদের সহযোগী। হাইকোর্ট রিমঝিম পুলিশ টাউনকে চিরতরে অবৈধ ঘোষণা করে জমি ফেরৎ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। মোখলেছুর রহমানের অবসনের পর জহির আশ্রয় নেন প্রলয় জোয়ারদারের সহযোগী ও বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের কাছে। মনিরুলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হওয়ার সুবাদে তাকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ইয়াবা পাচারকারীদের নিকট থেকে নিয়মিত মাসোহারা সংগ্রহের দায়িত্ব ছিল জহিরের। এছাড়া পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্ট কনস্ট্রাকশন কোম্পানীর মালামাল ক্রয়েও তিনি ১৫% বেশি দরে পণ্য ক্রয় করতে কর্মকর্তাদের বাধ্য করতেন। জুলাই আন্দোলনের পর তিনি ভোল পাল্টে পুলিশ সদর দপ্তরের ডেভেলপমেন্ট শাখায় পোস্টিং নেন, পরে আর্থিক সুযোগের আশায় পোর্সোনাল ম্যানেজমেন্ট-২ শাখায় বদলী হন। এই চক্রের সাথে আরও যুক্ত ছিলেন নারায়ণগঞ্জের সাবেক এসপি গোলাম রাসেল, সাভার-আশুলিয়ার জুলাই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত আসাদুজ্জামান এবং সাবেক ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক। এ চক্রের আরেক দুর্নীতিবাজ সাবেক ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুকের সহায়তায় পিওএইচিএস-২ এর জমি ক্রয়ের চুক্তি করে ২০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে রিমঝিম আবাসন কোম্পানী তথা জহির চক্র। পরে সেখানে আর্থিকভাবে কোনো সুযোগ নেই দেখে বদলী হন পোর্সোনাল ম্যানেজমেন্ট-২ শাখায়। প্রতিটি পণ্য পূর্বতন সাপ্লাইয়ারের চেয়ে কমপক্ষে ১৫% বেশি দরে ক্রয় করতে বাধ্য করা হয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
Leave a Reply