1. admin@deshibanglatv.com : dbtvlipu :
  2. deshibanglatv@gmail.com : dtvbangla :
  3. deshibanglatv0@gmail.com : newsdesk :
November 6, 2026, 10:19 am

১২ বছরে ১৫০ শ্রমিক নিহতের নেপথ্যে জাহাজভাঙা শিল্পের নিরাপত্তা

প্রতিবেদকঃ
  • হালনাগাদ সময়ঃ Saturday, October 24, 2026
  • 49 দেখা হয়েছে

সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে কর্মনিরাপত্তার অভাবে একের পর এক প্রাণ যাচ্ছে শ্রমিকের। সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর মৌলভীপাড়ায় তাঁদের বাড়ি।

গত ১৪ আগস্ট ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষাক্ত গ্যাসের কবলে পড়ে প্রাণ হারান মুনছুরসহ ১০ শ্রমিক। এই ঘটনায় মুনছুরের মেয়ে ২১ বছর বয়সী রেশমা আক্তার অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছেন। উচ্চমাধ্যমিক পাস করা রেশমা এখন বেকার, ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। যদিও সরকার থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে, কিন্তু জীবন ও জীবিকার অনিশ্চয়তা কাটছে না। কীভাবে সংসার চলবে, সেই দুশ্চিন্তায় কাটছে তাঁর দিন। ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষাক্ত গ্যাসে মারা যাওয়া ১০ শ্রমিকের একজন মুনছুর (৫৫)। সেখান থেকে মাসে কিছু টাকা পাওয়ার আশা করছেন। আগে মাসে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করতেন। মাসে পান প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। পরিবারটি ক্ষতিপূরণের ১০ লাখ টাকা পেয়েছে।

একই দুর্ঘটনায় নিহত সানি দাসের পরিবারেও চলছে চরম সংকট। ভাইয়ের মৃত্যুর পর তার শেষকৃত্য ও আনুষঙ্গিক কাজে ব্যস্ত থাকায় গার্মেন্টস কর্মজীবী বড় ভাই লিটন দাস চাকরি হারিয়েছেন। এখন বেকার লিটন ও অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে দিশেহারা পুরো পরিবার। ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পেলেও চিকিৎসা ও সংসারের খরচ শেষে অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে ঋণ শোধ করতেই হিমশিম খাচ্ছে তারা। তাঁর বড় ভাই লিটন দাস (২৫) একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। লিটনের ভাষ্য, ছেলের মৃত্যুর পর মায়ের শরীরও ভালো যাচ্ছে না। মা আবার গার্মেন্টসে চাকরি শুরু করছে।’।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১২ বছরে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা কারখানায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৫০ জন এবং আহত হয়েছেন ২৬৪ জন। বিলসের বার্ষিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ২৩ জন শ্রমিক মারা যান। দুর্ঘটনা শুধু পুরনো নয়, চলতি বছরের আগস্টেও ফেরদৌস স্টিলে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগের বছরগুলোতেও বিভিন্ন কারখানায় লোহার পাত, বিষাক্ত গ্যাস ও অগ্নিকাণ্ডে অকালে ঝরেছে অনেক প্রাণ। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে কারখানায় ছুটে গিয়েছিলেন রেশমারা। শুধু রেশমার পরিবার নয়, এক দশকের বেশি সময়ে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা কারখানায় দুর্ঘটনায় স্বজন হারিয়েছে শতাধিক পরিবার। সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে গেল ৮ প্রাণ। ফেরদৌস স্টিলের একই দুর্ঘটনায় মারা যান সহকারী শ্রমিক সানি দাস (২০)। প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত না হওয়ায় দুর্ঘটনা থামছে না। বিলসের হিসাবে, ২০১৫ সালে ১৬ জন, ২০১৬ সালে ১৮, ২০১৭ সালে ১৯, ২০১৮ সালে ১৩ এবং ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ২৩ শ্রমিক মারা যান। এরপর ২০২০ সালে ১০ জন, ২০২১ সালে ১৩, ২০২২ সালে ৭, ২০২৩ সালে ৭, ২০২৪ সালে ৭ এবং ২০২৫ সালে ৪ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৩ জন এবং আগস্টে ফেরদৌস স্টিলে আরও ১০ জন মারা যান।

দুর্ঘটনায় আহতদের অবস্থাও করুণ। ২০১৯ সালে ম্যাক করপোরেশনে হীরালালের মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়া বা জনতা স্টিলে মো. নাসিরের পা ক্ষতবিক্ষত হওয়ার মতো ঘটনায় শ্রমিকরা স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। বেঁচে ফেরা শ্রমিক দিপু দাসের মতে, দুর্ঘটনার শারীরিক আঘাতের চেয়ে মানসিকভাবে তারা এখনো ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্তের অভিযোগ, আইন থাকলেও কর্মক্ষেত্রে যথাযথ সুরক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাবই দুর্ঘটনার মূল কারণ। এই শিল্পের ঝুঁকি নিয়ে করা সাম্প্রতিক গবেষণায় ১০৫ ধরনের বিপদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে লোহা কাটা, বিপজ্জনক বর্জ্য অপসারণ ও ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালনায় সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন। গবেষকদের মতে, নিয়মিত তদারকি ও সুরক্ষাসামগ্রীর সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই এই মৃত্যুহার কমানো সম্ভব। তবু ঝুঁকি নিয়েই জাহাজ ভাঙছেন শ্রমিকেরা।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপমহাপরিদর্শক মো. মাহবুবুল হাসান জানান, সরকারি জনবল ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিয়মিত কারখানা পরিদর্শনের চেষ্টা করা হয়। নিয়ম লঙ্ঘন করলে নোটিশ ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যার অংশ হিসেবে ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধেও তিনটি মামলা হয়েছে। ততক্ষণে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল।

শিল্প মালিকদের দাবি, বর্তমানে ২৩টি কারখানার সবুজ সনদ রয়েছে, যার মধ্যে দুর্ঘটনার শিকার ফেরদৌস স্টিলও অন্তর্ভুক্ত। অথচ দুর্ঘটনার মাত্র ছয় মাস আগেই কারখানাটিতে নিরাপত্তার ঘাটতি চিহ্নিত করেছিল পরিদর্শন অধিদপ্তর। শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্তেও উঠে এসেছে, ছুটির দিনে কাজ চললেও কারখানাটিতে ছিল না কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থাপক, চিকিৎসক কিংবা জরুরি উদ্ধারকারী দল। এমনকি জাহাজের ট্যাংকগুলো যথাযথ পরীক্ষা না করেই নিরাপদ ঘোষণা করা হয়েছিল, যা ছিল চরম গাফিলতির শামিল।

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন চৌধুরীর ভাষ্যমতে, দুর্ঘটনারোধে নতুন নিরাপত্তা নির্দেশনা তৈরি এবং শ্রমিকদের জন্য প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কার্যত এই উদ্যোগ কতটুকু কার্যকর হয়, তা নিয়ে সংশয় থেকে যাচ্ছে ভুক্তভোগী শ্রমিক ও তাদের স্বজনদের মনে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© ২০২৬ দেশি বাংলা টিভি — সর্বসত্ব সংরক্ষিত
Developer By Zorex Zira