তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা অনেক আগেই আসলেও প্রকল্পের কাজ কবে নাগাদ শুরু হবে, তা নিয়ে নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা কাটছে না। দেশের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সরকারি প্রতিশ্রুতি থাকলেও মাঠ পর্যায়ে এখনো দৃশ্যমান কোনো কাজ শুরু হয়নি। জুনের আগে সমীক্ষা শেষ করে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে পারলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে।’। তিনি বলেন, ‘এখন আমার কাছে মনে হচ্ছে, তিস্তা নিয়ে শুধু রাজনীতি হচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে এখন আমাদের হতাশা ছাড়া আর কিছুই নেই।’। এরপর কাজ শুরু হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ছয়টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে ‘তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ’। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রকল্পের বাজেট অনুমোদন, সময়মতো রোডম্যাপ ঘোষণা, পৃথক তিস্তা কর্তৃপক্ষ গঠন, তিস্তা বন্ড চালু করা, নদী থেকে অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ এবং তিস্তার সাথে সংযুক্ত ২২টি শাখা নদী পুনরুজ্জীবিত করা। প্রস্তাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের মাধ্যমে তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহ, নদীর গঠন ও পরিবর্তন, পরিবেশ এবং আর্থসামাজিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, মহাপরিকল্পনাটি শুরুর প্রাথমিক ধাপ হিসেবে আন্তর্জাতিক মানের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় পরিকল্পনা কমিশনে ২৩ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। মূল প্রকল্প শুরুর আগে কারিগরি ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা যাচাই করাই এই সমীক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, এই সমীক্ষায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলাসহ তিস্তার পুরো বাংলাদেশ অংশের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে।
এর আওতায় নদীশাসন, খনন, নতুন ব্যারাজ নির্মাণ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। আগামী বছরের শুরুতে সমীক্ষা শুরুর আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, জুন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মহাপরিকল্পনার মূল কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
রংপুর বিভাগীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগ্রহ থাকায় নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে তিস্তার বর্তমান করুণ দশা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অক্টোবরেই নদী শুকিয়ে চর জেগে ওঠায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে তিস্তাপাড়ের মানুষের দুর্ভোগের কোনো সুরাহা না হওয়ায় স্থানীয়রা হতাশ। লালমনিরহাটের কৃষক আজিজুল ইসলাম বলেন, বারবার সমীক্ষার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। তার মতে, তিস্তা এখন রাজনীতির চক্রে বন্দি হয়ে পড়েছে। রংপুরের কাউনিয়ার কৃষক সহির উদ্দিন জানান, গত বছরও বিদেশি একটি দলের সমীক্ষার সময় তারা মতামত দিয়েছিলেন, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন আজও অধরা রয়ে গেছে। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার চর গড্ডিমারী এলাকার কৃষক আজিজুল ইসলাম (৬৫) জানান, এর আগেও কয়েকবার সমীক্ষার কথা শুনেছেন। এবারও নতুন করে সমীক্ষার উদ্যোগের কথা শুনছেন। বাস্তবে তাদের কষ্ট লাঘব করার উদ্যোগ কেউ নিচ্ছে না। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মধুপুর এলাকার কৃষক সহির উদ্দিন (৬০) জানান, গত বছর চীন ও বাংলাদেশের একটি দল তিস্তাপাড়ে সমীক্ষা চালিয়েছিল। তবে প্রস্তাবগুলো তিস্তাপাড়ের মানুষের চাওয়া ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।’।
তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, ‘তিস্তা বন্ড’ চালু করা হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সম্ভব হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নদীপাড়ের মানুষ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তিস্তা কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, মানুষ আর প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বাস্তব কাজ দেখতে চায়। সরকার এগুলো বিবেচনা করতেও পারে, আবার নাও করতে পারে।
তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, সমীক্ষার জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়েছে এবং দ্রুতই কাজ শুরু হবে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, ২০২৭ সালের মধ্যেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মূল কাজ শুরু করা হবে।
Leave a Reply