টানা আড়াইশ’ দিনের বেশি সময় সমুদ্রে অবস্থান করায় মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর হাজার হাজার সেনাসদস্য ভয়াবহ মানবিক ও মানসিক সংকটের মুখে পড়েছেন। রণতরীটিতে সুপেয় পানির তীব্র সংকট, বিকল শৌচাগার, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং পর্যাপ্ত খাবারের অভাব নাবিকদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এই পরিস্থিতির খবর প্রকাশ্যে আসার পর মার্কিন আইনপ্রণেতারা পেন্টাগনের কাছে জরুরি ভিত্তিতে জবাবদিহিতা দাবি করেছেন, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক নীতির ওপর নতুন করে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
সামরিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রণতরীটিতে দায়িত্বরত নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের এতটাই অবনতি হয়েছে যে, কেউ কেউ সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার মতো চরম পদক্ষেপ নিয়েছেন। চলতি মাসের শুরুর দিকেই এক নাবিক জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিলে তাকে হেলিকপ্টারের সাহায্যে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, লন্ড্রি ব্যবস্থার অভাব এবং তাজা খাবারের বদলে অপ্রতুল রেশনের কারণে নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নাবিকের স্বজন জানিয়েছেন, মিশনে যোগ দেওয়ার পর থেকে চরম মানসিক চাপে তার স্বজন প্রায় ২৯ কেজি ওজন হারিয়েছেন।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্রেট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে পাঠানো এক চিঠিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি পানির দূষণ, বিকল প্ল্যাম্বিং, নিরাপত্তার অভাব এবং দীর্ঘদিন চিঠি বা পার্সেল না পৌঁছানোর মতো গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। একই সুর মিলিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেস সদস্য মাইক লেভিন জানান, জাহাজে ছত্রাকযুক্ত গোসলখানা ও কাজ না করা টয়লেটের পাশাপাশি খাবারের সংকটে নাবিকদের কখনো কখনো মাত্র অর্ধকাপ চাল ও দুটি টর্টিলা খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। এছাড়া সাবান, টুথপেস্ট বা ডিওডোরেন্টের মতো জরুরি প্রসাধনসামগ্রীরও তীব্র ঘাটতি রয়েছে। পরিস্থিতি তদারকিতে আইনপ্রণেতারা একটি নিরপেক্ষ প্রতিনিধি দলকে সরাসরি জাহাজে পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গণমাধ্যমে আসা সংবাদকে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছেন। পানামায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, প্রতিটি জাহাজ ও নাবিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অতিরিক্ত দীর্ঘ এই মিশনে সেনাদের ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি দাবি করেন, প্রতিকূল পরিবেশ সত্ত্বেও সেনাদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছানো হচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযানের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা কিছুটা ব্যাহত হলেও বর্তমানে রসদ ও চিকিৎসা সামগ্রী পৌঁছানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। হোয়াইট হাউজের তরফ থেকেও দাবি করা হয়েছে যে, মার্কিন বাহিনীকে যেকোনো সামরিক হুমকি মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত উপাদানে সজ্জিত রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে রওনা হওয়া এই রণতরীটিকে দক্ষিণ চীন সাগর হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছিল। চলতি বছরের মে মাসে মিশন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বারবার এর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আব্রাহাম লিংকনের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’ রণতরীটিকে পাঠাতে প্রস্তুত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গবেষণায় দেখা গেছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শাখার তুলনায় নৌবাহিনীর নাবিকদের মধ্যেই উচ্চমাত্রার মানসিক চাপ ও আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
এক নাবিকের স্বজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এই মিশনে যোগ দেওয়ার পর থেকে চরম মানসিক চাপে পড়ে তার স্বজন প্রায় ২৯ কেজি ওজন হারিয়েছেন।
দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা ইঞ্জিনের শব্দ, যুদ্ধবিমানের ওঠা-নামার বিকট গর্জন এবং তীরে নামার কোনো সুযোগ না থাকায় নাবিকদের মধ্যে মানসিক অবসাদ চরম সীমায় পৌঁছেছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, মার্কিন নৌবাহিনী কি সত্যিই বর্তমানে এই উচ্চমাত্রার অপারেশনাল চাপ বজায় রাখতে সক্ষম?
Leave a Reply