অ্যাথলেটিকসের ইতিহাসে উসাইন বোল্টের মতো এমন কোনো অ্যাথলেট আর আসবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ট্র্যাকে তিনি কেবল অপ্রতিদ্বন্দ্বীই ছিলেন না, বরং বোল্ট মানেই ছিল একরাশ আনন্দ, উজ্জ্বল সূর্যকিরণ এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার এক জীবন্ত প্রতিশব্দ। বেইজিং অলিম্পিকের সেই রাতের কথা আজও অনেকের স্মৃতিতে অম্লান, যখন জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের ভিড় আর ধাক্কাধাক্কির মাঝেও বোল্ট তার রসবোধ দিয়ে সবাইকে মাতিয়ে রেখেছিলেন।
২০০৮ সালের ১৭ আগস্ট রাতে বার্ডস নেস্টে যা ঘটেছিল, তা ছিল অভাবনীয় ও অত্যাশ্চর্য। ১০০ মিটার স্প্রিন্টের মতো তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাময় ইভেন্টে যেখানে অ্যাথলেটরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেন, সেখানে বোল্ট প্রায় ২০ মিটার বাকি থাকতেই এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন। ১০ মিটার দূরে থাকতেই বুক চাপড়ে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করা এবং ফিনিশিং লাইনের অনেক আগেই উদ্যাপন শুরু করা—এমন দৃশ্য অ্যাথলেটিকসের ইতিহাসে বিরল। ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ডে ৯.৬৯ সেকেন্ডের টাইমিং ভেসে ওঠার সেই মুহূর্তটি আজও অনেকের কাছে মায়াবী বিভ্রমের মতো মনে হয়।
এথেন্স অলিম্পিকের সেই ১০০ মিটার স্প্রিন্ট ছিল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাময়, যেখানে ৯.৮৯ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করেও শন ক্রফোর্ড কোনো পদক পাননি। সেই দৌড়টি প্রতিযোগীদের সম্মিলিত নৈপুণ্যে স্মরণীয় হয়ে ছিল, কিন্তু বেইজিংয়ে বোল্ট একাই পুরো আসরের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিলেন। এরপর লন্ডন ও রিও অলিম্পিকেও বোল্টের আধিপত্য বজায় ছিল। ড্যালি টমসনের ভাষায়, উসাইন বোল্ট না থাকলে গত কয়েক বছরে অ্যাথলেটিকস খেলাটি হয়তো তলিয়ে যেত।
বোল্টের ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যানগুলো অবিশ্বাস্য। পুরুষ স্প্রিন্টারদের মধ্যে অলিম্পিকে দুবার ‘স্প্রিন্ট ডাবল’ জেতার রেকর্ড আগে কারও ছিল না, বোল্ট তা জিতেছেন তিনবার। ১০০ ও ২০০ মিটার এবং রিলের ‘ট্রিপল’ জয়ের কীর্তিও তিনি গড়েছেন তিনবার, যা অ্যাথলেটিকসে ‘ট্রিপল ট্রিপল’ হিসেবে পরিচিত। এছাড়া অলিম্পিক ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ মিলিয়ে ছয়বার স্প্রিন্ট ডাবল জয়ের রেকর্ডও তাঁর দখলে।
তবে এই বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের মাঝেও কিছু দুঃখের ছায়া রয়েছে। সতীর্থ নেস্টা কার্টারের ডোপিংয়ের কারণে বোল্টের একটি ‘ট্রিপল’ পদক হাতছাড়া হওয়া ছিল অ্যাথলেটিকস জগতের জন্য এক বড় ধাক্কা। ডোপিংয়ের অন্ধকার সময়ে বোল্ট সবসময় সত্য ও সুন্দরের প্রতীক হিসেবে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছেন।
বোল্টের সংবাদ সম্মেলনগুলো ছিল আনন্দের নির্ঝরিণী। তিনি নিজেই নিজেকে ‘লেজেন্ড’ বা ‘দ্য গ্রেটেস্ট’ বলে ঘোষণা করতেন, কিন্তু মোহাম্মদ আলীর মতো তাঁর এই আত্মঘোষণা কখনো ঔদ্ধত্য মনে হয়নি। লন্ডনে ২০১৭ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের আগে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি নিজের কিংবদন্তি হওয়ার যাত্রার কথা তুলে ধরেন। লন্ডন অলিম্পিকে তিনি বলেছিলেন, ‘স্প্রিন্ট ডাবল জিতলে আমি হব কিংবদন্তি’, আর রিওতে বলেছিলেন, ‘ট্রিপল জিতলে আমি হব অমর।’
ক্রিকেটে স্যার ডন ব্র্যাডম্যান যেমন একমেবাদ্বিতীয়ম, অ্যাথলেটিকসে উসাইন বোল্টও ঠিক তেমনই। ডেনিস কম্পটনের সেই বিখ্যাত উক্তিটি বোল্টের ক্ষেত্রেও শতভাগ প্রযোজ্য—তিনি এমন একজন অ্যাথলেট, যিনি কেবল জীবনে একবারই আসেন না, বরং একটি খেলার পুরো ইতিহাসে একবারই জন্ম নেন।
ব্যক্তিগতভাবে বোল্টের সঙ্গে আমার পরিচয় বেইজিং অলিম্পিকে। এরপর লন্ডন ও রিও অলিম্পিকেও তাঁর দৌড় কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। রিও অলিম্পিকের পর আমি মজা করে বলতাম, বোল্ট ও আমার মধ্যে একটি মিল আছে—আমরা দুজনেই চারটি অলিম্পিক কাভার করেছি। প্যারিস অলিম্পিক পর্যন্ত সেই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।
ট্র্যাকে বোল্টের দৌড় আর সংবাদ সম্মেলনে তাঁর হাসিখুশি রূপ মিলে এক অনন্য কোলাজ তৈরি করে। তিনি দর্শককে খেলার অংশ করে নিতে জানতেন। তাঁর এই প্যাকেজটি অ্যাথলেটিকস ছাড়িয়ে অন্য যেকোনো খেলার জন্যই এক বিশাল প্রাপ্তি।
বোল্টের জ্যামাইকান কিংবদন্তি বব মার্লেকে নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি অবলীলায় নিজেকে ‘দ্য গ্রেটেস্ট অব অলটাইম’ হিসেবে অভিহিত করেন। অথচ তাঁর কথাবার্তায় কখনো উদ্ধত ভাব প্রকাশ পায়নি। এই রহস্যের উত্তর হয়তো তাঁর সেই অকৃত্রিম আনন্দ আর অ্যাথলেটিকসের প্রতি ভালোবাসার মধ্যেই নিহিত।
পরিশেষে, বোল্ট কেবল রেকর্ড ভাঙার জন্য দৌড়াননি, তিনি দৌড়েছেন আনন্দ ছড়িয়ে দিতে। তাঁর মতো এমন কেউ আর কখনো আসবে না, এটিই এখন অ্যাথলেটিকস প্রেমীদের অমোঘ সত্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পেছনের খালি জায়গাটায় আমরা ৪০ থেকে ৫০ জন সাংবাদিক মানবজটলা হয়ে দাঁড়িয়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ‘জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলন’ বলে একটা কথা সংবাদমাধ্যমে খুব প্রচলিত, যেটি শুনলেই আমার ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকের ওই রাতের কথা মনে পড়ে যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বেশির ভাগ ১০০ মিটার স্প্রিন্ট শেষ হওয়ার পর যেখানে কে জিতল, তাৎক্ষণিকভাবে তা বোঝার উপায় থাকে না, সেটিতেই কিনা একজন প্রায় ২০ মিটার বাকি থাকতে এদিক-ওদিকে তাকাচ্ছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তারপরও ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ড জানিয়ে দিচ্ছে, এইমাত্র একটা বিশ্ব রেকর্ড হয়ে গেল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই জীবনে যত খেলা দেখেছি, বেইজিংয়ে বোল্টের ১০০ মিটারের চেয়ে অভাবনীয়, অচিন্তনীয়, অত্যাশ্চর্য কিছু আর দেখিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যেকোনো খেলার গ্রেটরাই কখনো কখনো এমন মুহূর্তের জন্ম দেন, যখন অবিশ্বাসে চোখ কচলে বলতে হয়, যা দেখলাম, তা কি সত্যি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ১০০ মিটারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বাকি থাকতেই উসাইন বোল্টের শুরু করা ওই উদ্যাপন, ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ডে ভেসে ওঠা ওই ৯.৬৯ টাইমিং—সে রাতে বার্ডস নেস্টে থাকা ভাগ্যবান ৯০ হাজার দর্শককেই মনে করিয়েছে অমন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বার্ডস নেস্টে বিশাল প্রেস গ্যালারি নিচ থেকে একেবারে ওপর পর্যন্ত বিস্তৃত।
Leave a Reply