
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, ক্ষমতার রদবদল এবং ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি বর্তমানে এক গভীর চোরাবালিতে আটকে পড়েছে। ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে নৃশংস দমন-পীড়নের মুখে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে, যার ফলে স্থানীয় জনমিতি ও অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে। এর ওপর রাখাইন থেকে নতুন করে অনুপ্রবেশ অব্যাহত থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কেবল নেপিদোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। রাখাইনের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী আরাকান আর্মির উত্থান এই সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্সের পরিচালক অধ্যাপক তৌফিক এম হক মনে করেন, ২০১৭-২০১৮ সালের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। তিনি জানান, প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, জীবিকা ও সম্পদের নিশ্চয়তা চায়, কিন্তু মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন এক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে আছে।
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার ব্যর্থতার ইতিহাস দীর্ঘ। ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর দুই দেশ প্রত্যাবাসন চুক্তি করলেও নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার অভাবে রোহিঙ্গারা ফিরতে রাজি হয়নি। পরবর্তী সময়ে চীন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্ত হলেও কোভিড-১৯ ও মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে সেই প্রক্রিয়া থমকে যায়। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে রাখাইনে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে লড়াই তীব্রতর হওয়ায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়েছে।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫২৫ জনের পরিচয় যাচাই করেছে এবং ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করেছে। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পরিসংখ্যান প্রত্যাখ্যান করেছে। মিয়ানমারে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সুফিউর রহমানের মতে, রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না করে এই যাচাইকরণ প্রক্রিয়া কেবল একটি ‘ডাহা প্রতারণা’ ও অর্থহীন উদ্যোগ।
আন্তর্জাতিক মনোযোগের ঘাটতিও এই সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে। গাজা, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বিশ্বনেতাদের নজর রোহিঙ্গা ইস্যু থেকে সরে গেছে। অধ্যাপক তৌফিক এম হক বলেন, বৃহৎ শক্তিগুলো তাদের অগ্রাধিকার পরিবর্তন করায় আন্তর্জাতিক ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়েছে। এছাড়া ভারত ও চীন তাদের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থে—যেমন কালাদান প্রকল্প বা পাইপলাইনের প্রয়োজনে—আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশকে এখন কেবল মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভর না করে নতুন কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে। আরাকান আর্মিকে রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি থাকলেও, তাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। সুফিউর রহমান সরকারি সংস্থা, রাজনৈতিক দল ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের নিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, ভারত ও চীন যদি বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন এই প্রক্রিয়ার বাইরে থাকবে—তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। তবে এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়াতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাকিস্তানে হাসপাতালে আগুন লেগে ১৫ নবজাতকের মৃত্যু। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নারী-শিশুদের জন্য সরকারি মাদক নিরাময়কেন্দ্র অপ্রতুল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এক যুগ পর স্কুলের বিরুদ্ধে আদালতে কনকাশনে ক্যারিয়ার হারানো পুকোভস্কি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সারা দেশে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী পালিত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সময়ে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে বিশ্ব ব্যস্ত থাকায় আন্তর্জাতিক মনোযোগ এবং মানবিক সহায়তার তহবিল হ্রাস পেয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ কিংবা রাখাইনের বর্তমান বাসিন্দাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ—কাউকেই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সহজতর করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যদি মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছায়ও, তবে যেকোনো টেকসই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্য আরাকান আর্মির সঙ্গে সম্পৃক্ততা বা আলোচনার প্রয়োজন হবে।’।
Leave a Reply