গত ৭ই সেপ্টেম্বর বেইজিংয়ে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানি এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন। দুই দিনের সরকারি সফরে থাকা কাতারের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে লি কিয়াং কাতারকে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের অন্যতম প্রধান কৌশলগত অংশীদার হিসেবে অভিহিত করেন। বৈঠকে জ্বালানি, বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাসের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
বর্তমান অস্থিতিশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উভয় দেশের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রণালীটি চীনের জ্বালানি সরবরাহ এবং কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির প্রধান পথ। উল্লেখ্য, চীনের মোট এলএনজি চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কাতার থেকে আসে। লি কিয়াং স্পষ্ট করেছেন যে, একটি ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বেইজিং ও দোহা বহুপাক্ষিক সমন্বয় বৃদ্ধি করবে।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে কাতারের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার প্রতি চীন পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছে। লি কিয়াং জানিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব এই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে কাতার, অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করতে বেইজিং প্রস্তুত। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানিও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরবর্তী ‘সোনালী দশক’ শুরুর আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বাণিজ্য, উচ্চ প্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদন খাতে চীনের সাথে অংশীদারিত্ব গভীর করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ঘটনাবলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কাতারে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত কাও জিয়াওলিনের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২০ সাল থেকে চীন কাতারের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং শীর্ষ রপ্তানি গন্তব্য। গত এক দশকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২০১৪ সালের ১০.৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ২৪.২২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
কাতারের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেশটির ভূমিকা বিশ্বরাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটিতে একটি বড় মার্কিন বিমান ঘাঁটি থাকা সত্ত্বেও ইরানের সাথে তাদের সুসম্পর্ক বজায় রয়েছে। এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানকে সামরিক হস্তক্ষেপের চেয়ে সংলাপ ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতি চীনের আগ্রহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে আগস্টের শেষ দিকে কাতারের প্রধানমন্ত্রী তেহরান সফর করেন। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করা এবং হরমুজ প্রণালীতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে সংলাপের একটি কাঠামো তৈরির প্রচেষ্টায় তিনি এই সফর করেছিলেন। বেইজিংয়ের সাথে সাম্প্রতিক এই বৈঠকটি মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিরসনে কাতারের কূটনৈতিক তৎপরতাকে আরও শক্তিশালী করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
Leave a Reply