রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার দুই মাস পার হয়ে গেলেও এখনো এখানে কোনো স্থায়ী জনবল নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবক ও আউটসোর্সিংয়ের কর্মীদের ওপর নির্ভর করে জাদুঘরটির কার্যক্রম চলছে, যা এই সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য যথেষ্ট নয়। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৩ হাজার দর্শনার্থীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। যেকোনো মুহূর্তে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টিরও আশঙ্কা আছে। আউটসোর্সিংয়ের ৪৪ জন, স্বেচ্ছাসেবক এবং স্কাউটের প্রায় ৪০ জন দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ছুটির দিনে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে উপচে পড়া ভিড়, বিশৃঙ্খলা–ভোগান্তি। ফলে মোট ১১টি শাখা নিয়ে গঠিত জুলাই জাদুঘরের মতো সংবেদনশীল একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জাদুঘরের তথ্য বলছে, গত ১৭ আগস্ট থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত জাদুঘরে আসা দর্শনার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৫৫ হাজার ৭৭০ জন। এরপর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়।
প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৩ হাজার দর্শনার্থী আসেন, তবে শুক্র ও শনিবার এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। ভাঙচুরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন।
টিকিট বিক্রির তথ্য বলছে, ৭ আগস্ট থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত জাদুঘরে প্রবেশের টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ৯৮ লাখ ৪৫ হাজার ৩৫১ টাকা। তিনি জানালেন, নিয়োগপ্রক্রিয়া দ্রুত শুরুর আশ্বাস দিয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এছাড়া গাড়ি পার্কিং থেকে আয় হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৮২১ টাকা। গত ২৮ জানুয়ারি এ নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
সব মিলিয়ে মোট আয় ৯৯ লাখ ৬৬ হাজার ১৭২ টাকা।
শুধুমাত্র ৯ অক্টোবর শুক্রবার টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৫২০ টাকা এবং শনিবার আয় হয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯০ টাকা।
৭ আগস্ট জাদুঘরটি উন্মুক্ত করে দেওয়ার পর দর্শনার্থীরা মূল ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন, তাই ১৭ আগস্টের আগপর্যন্ত মোট কত দর্শনার্থী জাদুঘরে ঢুকেছেন সেই তথ্য কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।
জাদুঘরটিতে প্রবেশের জন্য ফুটপাত দখল করে বানানো হয়েছে টিকিট কাউন্টার।
বাংলাদেশি প্রাপ্তবয়স্কদের টিকিটের দাম ৫০ টাকা।
৩ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ২০ টাকা, সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ৫০০ টাকা, অন্যান্য দেশের নাগরিকদের দুই হাজার টাকা লাগছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টানা দেড় দশকের আবাসস্থল ছিল ১৭ দশমিক ৬৮ একর আয়তনের গণভবন। বিশাল কমপ্লেক্স, উন্মুক্ত মাঠসহ ২৯ হাজার বর্গফুটের দ্বিতল ভবনটিতে পরিবার নিয়ে থাকতেন শেখ হাসিনা। বর্তমানে জাদুঘরটিতে ৫২২ শহীদের স্মারক জমা আছে। তবে স্মারকগুলো প্রদর্শনী করার ক্ষেত্রে কোনো কোনো শহীদের বেলায় পক্ষপাতমূলক আচরণ করা হয়েছে বলে শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। মনসুন থিয়েটার সেলুলয়েডে গত ১৬ বছরের অত্যাচার–নির্যাতনের বিভিন্ন সিনেমা ও ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হচ্ছে। দর্শনার্থীরা লাল টেলিফোনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিভিন্ন কথোপকথনের অডিও শোনার পাশাপাশি নিজেরাও ওই টেলিফোনে ব্যঙ্গাত্মকভাবে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার আহ্বান জানাচ্ছিলেন। শেখ হাসিনার অফিসকক্ষের মেঝেতে শক্ত কাচের নিচে রাখা হয়েছে ৫ আগস্ট জনগণের ভেঙে ফেলা বিভিন্ন জিনিস। গেজেট অনুযায়ী জুলাই শহীদদের ছবিসহ দালিলিক প্রমাণ হিসেবে প্রকাশনা বের করা, ১৫ বছরের নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করার পাশাপাশি জাদুঘরের মঞ্চে পালাগান, যাত্রা, বাউলগানসহ নানা আয়োজন করা হবে। বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ছুটির পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি ছুটির দিন জাদুঘর বন্ধ থাকে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও দাপ্তরিক কাজও হতো এ ভবনে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর গণভবনে ঢোকে জনতার স্রোত। সেদিন লোকজন গুরুত্বপূর্ণ নথি থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার ব্যবহৃত শাড়ি, তৈজসপত্র, পুকুরের মাছ, রান্না করা খাবার—সবই লুট করে নিয়ে যায়। গত ৫ আগস্ট এই জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জুলাই জাদুঘরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব ও যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ কামরুজ্জামান। এভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রেই সমস্যা হচ্ছে। গত ২৭ জুলাই ‘জুলাই জাদুঘর উদ্বোধন ৫ আগস্ট, জনবল নিয়োগ হয়নি এখনো’ শিরোনামের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) চাকরি প্রবিধানমালা ২০২৫ অনুযায়ী, বিভিন্ন পদে নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ৬ থেকে ২০ গ্রেডের ৬২টি পদে ৯৬ জনকে শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। দ্রুততম সময়ের মধ্যে জাদুঘরের কার্যক্রম শুরু করার স্বার্থে রাষ্ট্রপতি লিখিত পরীক্ষার পরিবর্তে সরাসরি মৌখিক ও দক্ষতা পরীক্ষণের প্রক্রিয়াটি ‘প্রমার্জন’ (শিথিল) করেছেন বলেও তখন কর্তৃপক্ষ জানায়। গত ৪ আগস্ট সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, জাদুঘরের জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। জাদুঘর নির্মাণের পাশাপাশি উদ্বোধনের আগে জাদুঘর পরিদর্শন করা অতিথিদের আপ্যায়ন বিলসহ অন্যান্য খাতেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হবে।
Leave a Reply