পাবনার ওয়ার্কশপ মালিক আব্দুস সালাম থেকে শুরু করে ধামরাইয়ের জুতা কারখানার উদ্যোক্তা রেজবিন হাফিজ—সবারই এখন অভিন্ন ভোগান্তি। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন প্রক্রিয়া বারবার থমকে যাচ্ছে। কেরানীগঞ্জের ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটের মালিক আবুল কাশেম টিটুর মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা জেনারেটর চালানোর মতো সামর্থ্য না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকছেন। এতে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতের প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ প্রতিষ্ঠান এখন বিদ্যুৎ সংকটের মুখে। এসব প্রতিষ্ঠান দেশের জিডিপিতে ৩০ শতাংশের বেশি অবদান রাখে এবং প্রায় ৩ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু বর্তমানে কোনো কোনো এলাকায় দিনের প্রায় অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ থাকছে না, যা এই খাতের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।
ধামরাই বিসিক শিল্প নগরীর পিপলস ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদারগুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজবিন হাফিজ জানান, কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে গত তিন বছরে উৎপাদন ব্যয় এমনিতেই বেড়েছে। এর ওপর লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন বিলম্বিত হওয়ায় ক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে, যা ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন করে তুলেছে।
পাবনার উদ্যোক্তা আবদুস সালাম জানান, আগে স্বাভাবিক কর্মদিবসে তিনি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা আয় করতেন। কিন্তু চারটি ভারী মেশিনের মধ্যে দুটি লেদ মেশিন দিনে ৩-৪ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হয়। গত কয়েক মাসে এটিই নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। সঞ্চয় ভেঙে শ্রমিকদের বেতন দিতে হচ্ছে জানিয়ে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, পরিস্থিতি এমন থাকলে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। দেশে ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সংকটে তা প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। বিশেষ করে কক্সবাজারের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গত ১১ আগস্ট সারা দেশে লোডশেডিং ৩ হাজার ৭ মেগাওয়াটে পৌঁছায়, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ।
কেরানীগঞ্জের মাফিয়া ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মালিক আবুল কাশেম টিটু জানান, দিনের অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ না পাওয়ায় তারা রাতে কাজ করার চেষ্টা করছেন, তবুও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ মিলছে না। আগে যে প্যাকেজিং মেশিন ৪০ দিনে সরবরাহ করা সম্ভব হতো, এখন তা দুই মাসেও শেষ করা যাচ্ছে না। ৪ লাখ টাকা বেতনের বোঝা মাথায় নিয়ে শ্রমিকদের বসিয়ে রেখেও বেতন দিতে হচ্ছে তাদের।
খুলনার এক লেদ ওয়ার্কশপের মালিক বুলবুল মিয়ার অবস্থাও একই। পাওয়ার টিলার ও ইজিবাইকের খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি করে আগে সব খরচ বাদে প্রতিদিন ১ থেকে দেড় হাজার টাকা আয় করতেন। কিন্তু বর্তমানে মাসিক ২০ হাজার টাকা খরচের বিপরীতে গত ১০ দিনে তার আয় হয়েছে মাত্র ৫ হাজার টাকা। খরচ মেটাতে না পেরে তিনি দিশেহারা।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, নানা চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকট ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তারা পণ্য বাজারজাত করতে পারছেন না এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা হারাচ্ছেন। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
প্রতিবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পাবনায় আব্দুস সালামের ওয়ার্কশপে কাজ জমতে থাকে।
এগুলো সবই ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।
বড় উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারকদের মতো জেনারেটর চালিয়ে মেশিন সচল রাখার সামর্থ্য তাদের নেই।
ফলে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট তাদের উৎপাদনশীলতা ও আয় কমছে।
এসব প্রতিষ্ঠানে ৩ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে।
লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে ওয়েল্ডিংয়ের দোকান, চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুতকারী ও পাড়ার লন্ড্রি—এসব ব্যবসা অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।
একই পরিমাণ পণ্য উৎপাদনে বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে, আবার কেউ কেউ পণ্য সরবরাহে সময়সীমা পূরণ করতে অনেক বেশি সময় নিচ্ছেন।
গত ৩০ বছর ধরে এই ব্যবসায় আছেন সালাম।
কয়েক দশক ধরেই শীতকাল ছাড়া বছরের বেশির ভাগ সময় লোডশেডিং সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
এর জেরে কমেছে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদন।
‘আমরা সত্যিই খুব খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে আছি।’
শ্রমিকেরা কাজ করতে না পারছে না, তারপরও আমরা তাদের বেতন দিচ্ছি।’
স্থায়ী মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি হ্রাস, বেসরকারি খাতে দুর্বল বিনিয়োগ এবং কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মতো অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বিদ্যুৎ সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন।
এ সপ্তাহের শুরুতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্তম শহর খুলনায় একটি ছোট লেদ ওয়ার্কশপের মালিক বুলবুল মিয়া হাতভর্তি নাট-বল্টু পরিষ্কার করছিলেন।
বিদ্যুৎ চলে গেলেই তারা দুজন এ ধরনের ছোটখাটো রক্ষণাবেক্ষণের কাজে হাত দেন।
লেদ মেশিনে বুলবুল মূলত পাওয়ার টিলার, ইজিবাইক ও স্থানীয়ভাবে নছিমন নামে পরিচিত শ্যালো ইঞ্জিনচালিত যানবাহনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি করেন।
সাধারণত তিনি প্রতিদিন ছোট-বড় মিলিয়ে ৮ থেকে ১০টি অর্ডার পান।
‘তারা যদি ঠিক মতো উৎপাদন করতে না পারেন, তাহলে পণ্য বাজারজাত করতে পারবেন না এবং ঋণের কিস্তিসহ অন্যান্য পরিশোধের দায় মেটানোর মতো পর্যাপ্ত আয়ও করতে পারবে না।
ফলে এর ধারাবাহিক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে,’ যোগ করেন আনোয়ার।
Leave a Reply