1. admin@deshibanglatv.com : dbtvlipu :
  2. deshibanglatv@gmail.com : dtvbangla :
  3. deshibanglatv0@gmail.com : newsdesk :
November 6, 2026, 7:22 am

নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম: রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি ও সাধারণের জীবন

প্রতিবেদকঃ
  • হালনাগাদ সময়ঃ Thursday, November 5, 2026
  • 9 দেখা হয়েছে

বাংলাদেশের বাজারে নিত্যপণ্যের অস্থিরতা দীর্ঘদিনের পুরোনো সমস্যা। স্বাধীনতার পরপরই সরকারি মালিকানাধীন পত্রিকা ‘দৈনিক বাংলা’ বাজারদর নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করত। ১৯৭১ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত প্রথম প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, ঢাকায় মাছ, ডিম ও শাকসবজির দাম কমেছে। কিন্তু এই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। মাত্র ২২ দিন পর, ১৯৭২ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে। তখন শিরোনাম ছিল, ‘দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, অতি মুনাফার লালসাই প্রধান কারণ’। সেই সময় থেকেই সরবরাহ কম থাকার যুক্তি দেখিয়ে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে ফেলার প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। শুরুটা ছিল এ রকম: ‘রাজধানী ঢাকা শহরসহ বাংলাদেশের সর্বত্র স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শুরু এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃ-প্রতিষ্ঠার পর হতে শহরে বিভিন্ন দ্রব্যাদির আমদানী দিন দিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব দ্রব্যাদির মধ্যে রয়েছে শাক-সবজি, মাছ, ডিম, মাংস ইত্যাদি।’। রিপোর্টটির শুরুটা ছিল এ রকম: ‘আজকাল জনজীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। কোন কোন জিনিসের দাম ইতিমধ্যেই আকাশচুম্বী হয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবার উপক্রম হয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম—এই মোক্ষম যুক্তি দেখিয়ে তাঁরা অর্থনীতি শাস্ত্রের সূত্র ধরেই জিনিসের দাম বাড়িয়ে চলেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্যে এটা নেহায়েতই স্বাভাবিক। কিন্তু, সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি থাকলেই যে সাড়ে ছ টাকার কেরোসিন তেল চব্বিশ টাকা বিক্রি করতে হবে তার পেছনে অতি মুনাফার লোভ ছাড়া অন্য কোন ন্যায়সঙ্গত যুক্তি নেই। এ ছাড়া এর পেছনে যে মজুতদার ব্যবসায়ী লালসা কাজ করছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। চাল, ডাল, সরিষার তেল, সাবান, শিশুখাদ্য, সিগারেট, দেশলাই, ব্লেড, ইত্যাদি হরেক রকমের জিনিসের মূল্যই বেড়েছে। কেননা, খাবারের দাম বাড়লে দরিদ্র মানুষের জীবন কঠিন হয়, এই চাপ অন্য ক্ষোভের সঙ্গে মিলে অস্থিরতা বাড়ায়।

সেই থেকে গত ৫৫ বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় কেবলই বেড়েছে। অর্থমন্ত্রীদের বাজেট বক্তৃতার বড় অংশজুড়ে সবসময় মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের কথা উঠে এসেছে, যেখানে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী। অবশ্য একই সময়ে দেশের আয় ও অর্থনীতি বড় হয়েছে, কিন্তু নিত্যপণ্যের দামের চাপে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। বিশেষত, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভোক্তা মূল্যসূচক ৫৪ শতাংশ বাড়লেও মজুরি সূচক বেড়েছে মাত্র ৪৫ শতাংশ। ফলে মজুরি বৃদ্ধি ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়েছে। শুধু যে নিত্য দিনের অতি আবশ্যকীয় কেরোসিনের দামই বেড়েছে তা নয়। কিন্তু আয় পাল্লা দিতে পারেনি ব্যয়ের সঙ্গে।

বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির ভয়াবহতা নতুন কিছু নয়। তত্ত্বগতভাবে যখন মাসিক মূল্যস্ফীতি ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, তাকে হাইপার-ইনফ্লেশন বলা হয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৪৬ সালের জুলাইয়ে হাঙ্গেরিতে প্রতি ১৫ ঘণ্টায় পণ্যের দাম দ্বিগুণ হতো। এছাড়া ১৯২৩ সালের অক্টোবরে জার্মানিতে মাসিক মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ শতাংশ, ২০০৮ সালের নভেম্বরে জিম্বাবুয়েতে ৭ হাজার ৯৬০ কোটি শতাংশ এবং ১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে যুগোস্লাভিয়ায় প্রায় ৩১ কোটি ৩০ লাখ শতাংশ মূল্যস্ফীতি রেকর্ড করা হয়েছে। ভেনেজুয়েলা ও আর্জেন্টিনাতেও একই ধরনের অর্থনৈতিক দুর্যোগ দেখা গিয়েছিল। অতিমূল্যস্ফীতির উদাহরণও অনেক আছে, যাকে তত্ত্বগতভাবে বলা হয় হাইপার–ইনফ্লেশন। বিশ্বে সবচেয়ে ভয়াবহ হাইপার–ইনফ্লেশনের ঘটেছিল হাঙ্গেরিতে। ভেনেজুয়েলায় ২০১৮ সালে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার শতাংশ, আর আর্জেন্টিনায় ১৯৮৯ সালের জুলাইয়ে এক মাসে দাম বেড়েছিল ১৯৬ দশমিক ৬ শতাংশ।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি কেবল দৈনন্দিন দুর্ভোগ নয়, রাষ্ট্রকেও রাজনৈতিক সংকটে ফেলে। ২০১১ সালের ‘ফুড প্রাইসেস অ্যান্ড পলিটিক্যাল ইনস্ট্যাবিলিটি’ শীর্ষক গবেষণা অনুযায়ী, খাদ্যমূল্য বাড়লে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পেছনেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বড় প্রভাব ছিল। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের (ওএইচসিএইচআর) ২০২৫ সালের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টেও বিক্ষোভের অন্যতম কারণ হিসেবে তরুণদের কর্মসংস্থান সংকট, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর এই চাপ কেবল জনজীবনে দুর্ভোগ আনে, তা নয়, রাষ্ট্রও বিপদে পড়ে। ২০১১ সালে এক গবেষণায় এমনটাই দেখা গেছে। ‘ফুড প্রাইসেস অ্যান্ড পলিটিক্যাল ইনস্ট্যাবিলিটি’ নামের সেই গবেষণায় ১৯৭০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ১২০টির বেশি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। কেবল নিম্ন আয় ও উন্নয়নশীল দেশেই এমনটা ঘটছে, তা–ও নয়।

বর্তমানে বাংলাদেশ ১৯৯০ সালের পর থেকে সবচেয়ে দীর্ঘ অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্ন প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের অভাবে দেশের অর্থনীতি ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর কবলে পড়েছে। পিপিআরসির ২০২৫ সালের হিসাব বলছে, প্রায় ১৮ শতাংশ পরিবার দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে থাকলেও যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কায় দারিদ্র্যে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২১ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ মূল্যস্ফীতির দীর্ঘ পর্ব চলে ১৯৬৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত।

সাধারণ মানুষের ওপর এই চাপের বাস্তব উদাহরণ হলো একটি চারজনের পরিবার। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে যে পণ্য কিনতে ২০ হাজার টাকা লাগত, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে তার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৮০০ টাকায়। অথচ আয় যদি ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তবে তা হয় ২৯ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসেই পরিবারটির প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকার ঘাটতি থেকে যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫’ অনুযায়ী, জরিপের আগের ১২ মাসে দেশের ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার নিত্যপণ্যের খরচ মেটাতে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে।

২০২৬ সালে প্রকাশিত ‘গভর্নিং ফর গ্রোথ’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক দেশে অর্থনীতি ভালো থাকলে অর্থমন্ত্রীদের টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে।

অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে ১০ শতাংশ বিন্দু বেশি হলে উগ্র ও জনতুষ্টিবাদী দলগুলোর ভোট ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, বর্তমান সরকার এই সংকটের গভীরতা কতটা অনুধাবন করছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে দ্রুত সংকট কাটার কোনো ইতিবাচক পূর্বাভাস নেই। বর্তমান অর্থমন্ত্রী পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও দুই বছর সময় চেয়েছেন। তবে সাধারণ মানুষ এই দীর্ঘ সময় কতটা ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষ সব সময় অনুভব করে এসেছেন, কেন মূল্যস্ফীতিকে অর্থনীতিবিদেরা নীরব ঘাতক বলে থাকেন। ১৯৭৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড মূল্যস্ফীতিকে ‘পাবলিক এনিমি নম্বর ওয়ান’ বা ‘এক নম্বর গণশত্রু’ বলেছিলেন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© ২০২৬ দেশি বাংলা টিভি — সর্বসত্ব সংরক্ষিত
Developer By Zorex Zira