জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি থাকলেও বারবার ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা। আবদ্ধ জায়গায় শ্রমিক পাঠানোর আগে গ্যাস পরীক্ষা, লোহা কাটার আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত তদারকির অভাবকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে দেশের জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় অন্তত ১৩৭ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আরও তিনজন মারা গেছেন। গত শুক্রবার সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে নয়জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় ২০১৫ সাল থেকে চলতি আগস্ট পর্যন্ত মোট প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ১৪৯ জনে।
সর্বশেষ এই দুর্ঘটনাটি ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কারখানাটি পরিদর্শন করে নিরাপত্তা ঘাটতি ও অনিয়ম খুঁজে পান। শ্রমিকদের যথাযথ সচেতনতা না থাকা, ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন না দেওয়া এবং অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার বিপরীতে মজুরি না দেওয়ার মতো বিষয়গুলো উঠে আসে। এসব অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে একাধিক নোটিশ দেওয়া হয় এবং গত জুলাই মাসে শ্রম আদালতে মামলাও করে অধিদপ্তর। সেই মামলার এক মাসের মাথায় একই কারখানায় ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হলো।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১১ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিল্পসচিব আবদুন নাসের খান শনিবার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানান, ঘটনাস্থলে কী ধরনের গ্যাস ছিল এবং সেগুলোর মাত্রা কত, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রাথমিক পরীক্ষায় হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এছাড়া অ্যামোনিয়া ও কার্বন অক্সাইডজাত গ্যাসের অস্তিত্বও মিলেছে।
বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন জানান, দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর পরীক্ষায় বাতাসে ১০ দশমিক ৮ পিপিএম মাত্রায় হাইড্রোজেন সালফাইড পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, হাইড্রোজেন সালফাইড অত্যন্ত বিষাক্ত গ্যাস। বদ্ধ ট্যাংকে পানি বা পচনশীল জৈব পদার্থ জমে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হলে এই গ্যাস উৎপন্ন হয়, যা দ্রুত মানুষকে অচেতন বা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে।
কারখানার মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ অবশ্য নিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তাসামগ্রী মেনেই কাজ চলছিল এবং শুক্রবার নিয়মিত জাহাজ কাটার কাজ ছিল না। শ্রম আদালতে মামলার বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান।
বর্তমানে দেশে ৮৪টি নিবন্ধিত জাহাজভাঙা কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে ২৩টি গ্রিন ইয়ার্ড হিসেবে স্বীকৃত। বিলসের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২৮টি দুর্ঘটনার রেকর্ড রয়েছে। এর মধ্যে ভারী বস্তু পড়ে, ক্রেন বা হুকের ত্রুটি, আগুন ও বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। শ্রমিকনেতাদের অভিযোগ, অনেক কারখানায় হেলমেট, গ্লাভস ও নিরাপত্তা জুতার মতো সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয় না অথবা নিয়মিত ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকে না।
নিহত নয়জনের মধ্যে আটজনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক জানান, মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট হওয়ায় পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু আবদুল আলীমের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ঘটনার পর শিল্প মন্ত্রণালয় ছাড়াও জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন পৃথক তদন্ত করছে। জেলা প্রশাসনের ৯ সদস্যের কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট।
এখনও পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের হয়নি। নিহতদের স্বজনদের কেউ কেউ কারখানা কর্তৃপক্ষের চাপের আশঙ্কায় মামলা করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন। চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানান, পরিবারের সঙ্গে আলোচনা চলছে। যদি পরিবার মামলা না করে, তবে পুলিশ বাদী হয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেবে এবং নিহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হবে।
শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য ও ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের নেতা তপন দত্ত দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, সেখানে নিরাপত্তার বড় ঘাটতি ছিল। তিনি দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ইয়ার্ডে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাসামগ্রীর ব্যবহার নিশ্চিত করেই শ্রমিকদের কাজে নামানো হয়।
২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর ওপর থেকে পড়ে খলিলুর রহমান নামের এক শ্রমিক মারা যান।
২০২৩ সালে বৈদ্যুতিক কাজ করতে গিয়ে বাবু নামের এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
শ্রমিকের জন্য হেলমেট, নিরাপত্তা জুতা, গ্লাভসসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী থাকার কথা।
ছয় মাস আগেই সরকারি পরিদর্শনে ফেরদৌস স্টিলে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘাটতি ধরা পড়লে প্রতিষ্ঠানটিকে নোটিশ দেওয়া হয়।
গ্রিন ইয়ার্ড হলো যেখানে শ্রমিকের নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নির্ধারিত মান অনুসরণ করা হয়।
তখন শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে যথাযথভাবে সচেতন না করা, ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন না দেওয়া এবং কর্মঘণ্টা–সংক্রান্ত অনিয়মসহ কয়েকটি বিষয় তাঁদের নজরে আসে।
শ্রম পরিদর্শক শাহেদ পারভেজের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো শ্রমিককে নির্ধারিত আট ঘণ্টার বেশি কাজ করানো হতো।
কিন্তু অতিরিক্ত সময়ের (ওভারটাইম) টাকা দেওয়া হতো না।
‘এমটি রাসি’ নামের পুরোনো এলএনজিবাহী জাহাজের একটি অংশে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন শ্রমিকেরা।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তেই বের হবে।
কম মাত্রায় পচা ডিমের মতো গন্ধ থেকে এর উপস্থিতি বোঝা যেতে পারে।
মাত্রা বাড়লে চোখ ও শ্বাসতন্ত্রে জ্বালা, শ্বাসকষ্টসহ নানা সমস্যা হতে পারে।
তাদের তথ্য বলছে, দুর্ঘটনার ধরন ভিন্ন হলেও ঝুঁকির অনেকগুলোই দীর্ঘদিন ধরে চিহ্নিত।
ভারী গার্ডার বা অন্য বস্তু পড়ে নয়টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
ক্রেন, হুক ও তারের সঙ্গে সম্পর্কিত দুর্ঘটনা আটটি।
সংস্থাটি অনিরাপদ কর্মপদ্ধতি, ত্রুটিপূর্ণ কর্মপরিবেশ, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীর ঘাটতি, দুর্বল তদারকি ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবকে ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
শ্রমিক, শ্রমিকনেতা ও বেসরকারি সংস্থাগুলোরও অভিযোগ, অনেক ইয়ার্ডে প্রয়োজনমতো হেলমেট, গ্লাভস, নিরাপত্তা জুতা, চোখ ও মুখ রক্ষার সরঞ্জাম পাওয়া যায় না।
তাই পরিবারগুলো মামলা করতে চাইছে না।
Leave a Reply