নাটোরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর প্রশাসনের শীর্ষ চার কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করায় জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। গত ১২ আগস্ট ফ্যামিলি কার্ড শুমারির নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনার জেরে লালপুর ও বাগাতিপাড়ার ইউএনও কার্যালয়ে বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরপরই কর্মকর্তাদের এই বদলি বা প্রত্যাহারের বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে বেশ গুরুত্ব পেয়েছে।
ঘটনার ধারাবাহিকতায়, গত ১৭ আগস্ট সোমবার সন্ধ্যায় লালপুর ও বাগাতিপাড়ার ইউএনও কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বাদী হয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় পৃথক দুটি অভিযোগ দায়ের করেন। বাগাতিপাড়ায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের সাতজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ১৪০ থেকে ১৫০ জনকে এবং লালপুরে ১৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৬০ থেকে ৭০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযোগ দায়েরের তিন দিন পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তা মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়নি বলে জানা গেছে।
অভিযোগ দায়েরের ঠিক পরদিন মঙ্গলবার নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন ও লালপুরের ইউএনও বরকত উল্লাহকে প্রত্যাহার করা হয়। এর পরের দিন বুধবার বাগাতিপাড়ার ইউএনও দেবাশীষ বসাককেও প্রত্যাহার করা হয়। একই সময়ে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার এ এন এম বজলুর রশীদকেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। এই দ্রুত বদলি বা প্রত্যাহারের সঙ্গে থানায় অভিযোগ দেওয়ার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয় সুশীল সমাজের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) নাটোরের সাধারণ সম্পাদক বুলবুল আহমেদ বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে মিছিল করে সরকারি দপ্তরে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা করা স্বাভাবিক। কিন্তু অভিযোগ করার পরপরই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়াটা অস্বাভাবিক। এতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে এবং তারা ভবিষ্যতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে সাহস হারাবেন বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তবে বিদায়ী জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন এই বদলিকে সরকারি চাকরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখছেন। তিনি জানান, বদলির আদেশের সঙ্গে অন্য কোনো ঘটনার সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে, বিএনপি নেতাদের দাবি, ইউএনও কার্যালয়ের ঘটনায় অভিযোগ দেওয়ার সঙ্গে কর্মকর্তাদের বদলির কোনো সম্পর্ক নেই। জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা যেতেই পারে, কিন্তু ঢালাওভাবে দলীয় পদপদবি উল্লেখ করে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার পেছনে ষড়যন্ত্র থাকতে পারে বলে তারা মনে করেন।
এদিকে, মামলা রেকর্ড না হওয়া প্রসঙ্গে লালপুরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাসুদ রানা ও বাগাতিপাড়ার প্রশাসনিক কর্মকর্তা শুকুর আলী জানান, তারা থানায় অভিযোগ দিয়ে এসেছেন এবং এখন পুলিশের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও মামলা নথিভুক্ত না করার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বাগাতিপাড়া থানার উপপরিদর্শক আবদুর রাজ্জাকও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ কিছু জানাননি এবং তিনি এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেননি। কোনো নতুন তথ্য পাওয়া গেলে তা জানানো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রশাসনিক এই রদবদল এবং মামলা দায়েরের ধীরগতি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা জল্পনা-কল্পনা অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নাটোরে দুই ইউএনওর কার্যালয় ঘেরাও করে ছাত্রদল-যুবদলের বিক্ষোভ, ভাঙচুর।
Leave a Reply