
মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চীন থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানির জন্য একটি গোপন বিনিময়ভিত্তিক বাণিজ্যব্যবস্থা ব্যবহার করছে ইরান। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওষুধ, যানবাহন ও যোগাযোগ সরঞ্জামসহ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ইরানে প্রবেশ করেছে। এমনকি গত এক বছরে কয়েক মিলিয়ন ডলারের বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের চুক্তিতেও এই বিশেষ ব্যবস্থাটি ব্যবহৃত হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ইরানের দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং আরও তিনজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এই গোপন ব্যবস্থায় ইরানি তেলের অর্থ সরাসরি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং চ্যানেলে চীনা রপ্তানিকারকদের কাছে পাঠানো হয় না। বরং তেল বিক্রির অর্থ চীনা পণ্য আমদানির জন্য ক্রেডিট হিসেবে জমা রাখা হয়। সূত্রগুলোর মতে, এই কৌশলটি ইরানের জন্য মার্কিন চাপের মুখে একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক পথ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে চীনও এতে লাভবান হচ্ছে; বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশটি ছাড়মূল্যে ইরানি তেল পাওয়ার সুযোগ ধরে রাখছে এবং তাদের ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থেকে নিজেদের আড়াল করতে পারছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে চীনে অবস্থিত ‘চুশিন’ নামের একটি অস্পষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠান। পশ্চিমা একটি সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট আরও দুজনের ভাষ্যমতে, চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ঝুহাই ঝেনরংয়ের হয়ে কাজ করা একটি ক্রেতা চলতি বছর পর্যন্ত প্রতি মাসে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার চুশিনে জমা দিত। এই অর্থ ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানির (এনআইওসি) সংশ্লিষ্ট হংকং-নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পণ্য আমদানির বিল পরিশোধে ব্যবহৃত হতো। এরপর চুশিন সেই অর্থ চীনা রপ্তানিকারক ও অবকাঠামো নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পৌঁছে দিত।
সূত্রগুলোর হিসাবে, চুশিনের মাধ্যমে আসা ইরানি তেল বিক্রির অর্থের প্রায় ৭০ শতাংশ অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় হয়। বাকি অর্থ একটি বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিষ্ঠানের (এসপিভি) হিসাবে রাখা হয়, যা পণ্য সরবরাহকারীদের বিল পরিশোধে ব্যবহৃত হয়। ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দুটি সূত্র এই এসপিভির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে। তাদের ভাষ্যমতে, এই এসপিভি দুটি প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত হয়—যার একটি চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হয়ে এবং অন্যটি ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে কাজ করে। গত এক বছরে এই এসপিভির মাধ্যমে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ডলার লেনদেন হয়েছে।
তবে রয়টার্স চীনের কোনো কোম্পানি নিবন্ধন নথিতে ‘চুশিন’ বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি রেকর্ড খুঁজে পায়নি। একটি সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে, চুশিন হয়তো কেবল একটি স্প্রেডশিটে থাকা নাম। ২০২১ সাল থেকে এই ব্যবস্থাটি কার্যকর রয়েছে। শুরুতে এটি ইরানে ওষুধ ও কোভিড-১৯ টিকা সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত হলেও, পরবর্তীতে মার্কিন চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর পরিধি ও গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।
যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইরানের তেল কেনা বা পরিবহনে সহায়তা করা কিছু ছোট চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। গত আগস্টে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে, অন্যথায় তারা ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় ওয়াশিংটন এখনো কঠোরতম পদক্ষেপ থেকে বিরত রয়েছে।
এদিকে, গত ১৪ জুলাই থেকে নতুন করে মার্কিন নৌ অবরোধ পুনর্বহালের পর থেকে ইরানের কোনো অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ সফলভাবে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে চীনে পৌঁছাতে পারেনি বলে রয়টার্স জানিয়েছে। তবে এই অবরোধের প্রভাব এই গোপন বাণিজ্যব্যবস্থায় ঠিক কতটা পড়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পণ্যবাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের সমুদ্রপথে পাঠানো তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি চীন কিনেছে, যার পরিমাণ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল।
ইরান ও চীন ২০২১ সালে জ্বালানি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে ২৫ বছরের একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাষক আন্দ্রেয়া ঘিসেল্লির মতে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে চীন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলা করছে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে দেশটিকে সহজে বাধ্য করা যাবে না—এমন বার্তা দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে চীন তাদের ব্যাংক ও কোম্পানিগুলোকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি থেকে দূরে রাখতে চায়, যার ফলে তারা ‘দায় অস্বীকার করার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ’ বজায় রাখছে।
এ বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা প্রতিবেদনে বর্ণিত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত নয় এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি বা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনহীন একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে চীন। অন্যদিকে, ইরানের জাতিসংঘ মিশন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ঝুহাই ঝেনরং এবং ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানি রয়টার্সের প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি। মার্কিন প্রশাসনও এই নির্দিষ্ট বাণিজ্য ব্যবস্থা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর প্রচেষ্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির ওপর চাপ আরো বাড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে সেই চুক্তির বিস্তারিত এখনো খুব বেশি প্রকাশ্যে আসেনি।
Leave a Reply