জার্মানির রাজধানী বার্লিনে তিন দিনব্যাপী বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন শুরু হয়েছে রবিবার ১১ অক্টোবর। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সংকট থেকে স্থিতিস্থাপকতা: স্বাস্থ্যের জন্য উদ্ভাবন।’ বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ, নতুন সম্ভাবনা এবং বর্তমান সংকট নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বার্লিনে সমবেত হয়েছেন। মঙ্গলবার পর্যন্ত এই সম্মেলন চলবে। ‘ওয়াল্ড হেলথ সামিট ২০২৬’ -এ এবারের প্রতিপাদ্য ‘সংকট থেকে স্থিতিস্থাপকতা: স্বাস্থ্যের জন্য উদ্ভাবন। বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সংলাপ এবং সহযোগিতার মাধ্যমে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান খোঁজাই এর মূল লক্ষ্য।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই সম্মেলনে বিশেষ বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ এবং গ্রামীণ হেলথটেক লিমিটেড নিয়ে কথা বলার কথা ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে জানা গেছে যে, তিনি সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না। সম্মেলনের যোগাযোগ ও প্রেস বিষয়ক পরিচালক আনা স্টর্মার জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যগত কারণে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্মেলনে অনুপস্থিত থাকছেন। এদিকে, এই সম্মেলনে ডা. জোবাইদা রহমান অংশ নিচ্ছেন। পেশাগতভাবে চিকিৎসক ডা. জোবাইদা রহমান জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে জনস্বাস্থ্য সংস্কার ও সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন বলে সম্মেলনের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে অংশ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা.জোবাইদা রহমান।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সম্মেলনে অংশগ্রহণ নিয়ে গত তিন সপ্তাহ ধরে বিতর্ক চলছিল। ইউরোপের পাঁচটি আন্তর্জাতিক সংগঠন—সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরাম, ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরাম, ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশ ইন জার্মানি, আর্থ সিভিলাইজেশন নেটওয়ার্ক এবং ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস অ্যালায়েন্স—বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি স্মারকলিপি ও পিটিশন দিয়েছিল। তাদের দাবি ছিল, ড. ইউনূসের অংশগ্রহণ পুনর্বিবেচনা করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২৩ এপ্রিলের প্রতিবেদনে উঠে আসে, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিলের মধ্যে বাংলাদেশে ১৯ হাজার ১৬১ জন সন্দেহভাজন হামে আক্রান্ত হয় এবং ২ হাজার ৯৭৩টি পরীক্ষাগারে নিশ্চিত সংক্রমণ পাওয়া যায়। এসময় হাম-সম্পর্কিত মৃত্যু হয় ১৬৬ জনের, যার মধ্যে ৩০টি মৃত্যু ছিল নিশ্চিত। আক্রান্তদের মধ্যে ৭৯ শতাংশ শিশুর বয়স ছিল পাঁচ বছরের নিচে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই পরিস্থিতিকে ‘উচ্চ ঝুঁকি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। একই সময়ে ১৬৬টি সন্দেহভাজন এবং ৩০টি নিশ্চিত হাম-সম্পর্কিত মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একই সঙ্গে বাংলাদেশে চলমান সংক্রমণ, বিপুলসংখ্যক টিকাবিহীন বা টিকা-ঘাটতিসম্পন্ন শিশু এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতির কারণে জাতীয় পর্যায়ে ঝুঁকিকে ‘উচ্চ’ বলে মূল্যায়ন করেছিল।
পিটিশনকারীদের অভিযোগ, বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন ও ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার জন্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা দায় এড়াতে পারেন না। তাদের ভাষ্যমতে, এটি কেবল জনস্বাস্থ্য বা একটি রোগের প্রাদুর্ভাবের বিষয় নয়, বরং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতারও প্রশ্ন। সংগঠনগুলো দাবি জানিয়েছিল, যদি ড. ইউনূসের আমন্ত্রণ বহাল থাকে, তবে যেন তাকে বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আলোচনার টেবিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশ থেকে এই দুই অতিথির রোববার ও সোমবার দুটি অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার কথা উদোক্তারা জানিয়েছিল। পিটিশনকারীদের বক্তব্য, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন, টিকার প্রাপ্যতা ও সরবরাহ, সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে যে প্রশ্নগুলো বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সেগুলোর স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা প্রয়োজন।
এই স্মারকলিপি ও পিটিশনের পাশাপাশি জার্মান আওয়ামী লীগ ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা সম্মেলন স্থলের বাইরে বিক্ষোভের আয়োজন করেছিলেন, যার জন্য ৪০০ জনের অংশগ্রহণের পুলিশি অনুমতিও নেওয়া হয়েছিল। শনিবার বার্লিন পুলিশ কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভের অন্যতম আয়োজক মিজানুর হক খানকে ড. ইউনূসের সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
উল্লেখ্য যে, বার্লিনের শারিতে বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ৩০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০৯ সালে প্রথম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন আয়োজিত হয়। ১৪ থেকে ১৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সেই সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিবর্তন’। তখন থেকেই বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এটি প্রতি বছর আয়োজিত হয়ে আসছে।
Leave a Reply