মাত্র ৫ সপ্তাহের ব্যবধানে বাংলাদেশের পাঁচজন খ্যাতিমান ব্যক্তি চরম হেনস্থার শিকার হয়েছেন। এই নাজেহালের ঘটনাগুলো কেউ প্রকাশ্যে আবার কেউ নেপথ্য থেকে ঘটিয়েছেন। ভুক্তভোগীদের কেউ দেশের অভ্যন্তরে, আবার কেউ প্রবাসে অবস্থান করছেন। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো, তারা সকলেই বাংলাদেশের কৃতী সন্তান এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপরিচিত। এই হেনস্থা ও নাজেহালের পেছনে স্বদেশীদেরই সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার মধ্যে মামলা, মোকদ্দমা এবং ধরপাকড়ের মতো বিষয়গুলোও যুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে, কোথাও কোথাও প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। মাত্র ৫ সপ্তাহে ৫ খ্যাতিমান নাজেহাল। সবাই হেনস্থা হয়েছেন স্বদেশীদের দ্বারাই। ‘মব’ সংস্কৃতির বিষয়টি এখন সর্বত্র আলোচিত। দলীয় দৃষ্টিকোণে অনেকে প্রশংসাও করছেন। তবে হেনস্থাকারীরা পাল্টা হেনস্থার শিকারও হচ্ছেন। এই সময়েই ঢাকায় ঘটলো সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে মাখানো হলো কালি।
ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তার পারিবারিক প্রেক্ষাপট ও জীবনধারা নিয়ে নানা সময়ে বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে বাঈজীবাড়ি পরিচালনার মতো বিষয়ও রয়েছে। বাংলা সাহিত্যের এই দিকপালের জন্ম ১৮৬১ সালের ৭ মে বা ২৫ বৈশাখ এবং মৃত্যু ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট। তবে বর্তমানে তার আদর্শ ও ভাবমূর্তি নিয়ে যে বিতর্ক বা হেনস্থা তৈরি হচ্ছে, তা নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্মানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছিলেন। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে এসব ঐতিহাসিক বিষয়ের আড়ালে তাকে বিতর্কিত করার অপপ্রয়াস দৃশ্যমান। প্রথম আঘাত রবীন্দ্রনাথ কৌশলে নিয়ন্ত্রিত সংঘাত অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে হিন্দু সম্প্রদায়ের পবিত্র ‘মহালয়া’। আটদিন পরই পবিত্র দুর্গা পূজর মহোৎসব।
তালিকায় থাকা সমসাময়িক ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন জিএম কাদের। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে তিনি আওয়ামীপন্থী। শেখ হাসিনার সঙ্গে গোপন আঁতাতের অংশ হিসেবে ফোনে কথা বলার বিষয়টিও সামনে এসেছে। তিনি টিভির সামনে দাঁড়িয়ে বিএনপি-আতঙ্কে থাকার কথা স্বীকার করেছেন এবং আর বিএনপিতে ফিরবেন না বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন। এই রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বিষয়টি থানা-পুলিশ পর্যন্ত গড়িয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরে এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন শেখ হাসিনার পুত্র ও সাবেক প্রযুক্তি উপদেষ্টা। তার হেনস্থার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এছাড়া ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো ব্যক্তিবর্গও এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। জনপ্রিয় মডেল ও অভিনেত্রী বাঁধনও এই তালিকায় বাদ পড়েননি।
সম্প্রতি এক রাজনৈতিক নেতা আয়াসকে ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তাকে আদালতে তুললে আদালত তার জামিন আবেদন খারিজ করে দেন এবং পুলিশ রিমান্ডে নেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। যদিও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে বেশ তৎপর হতে হয়েছে এবং ততোক্ষণে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মামলা-মোকদ্দমা ও আইনি মারপ্যাঁচে জড়িয়ে খ্যাতিমানদের হয়রানি করার প্রবণতা এক ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল আইনি লড়াই নয়, বরং সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার যে প্রক্রিয়া চলছে, তা দেশের বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ভুক্তভোগীদের তালিকাটি ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে, যা সচেতন মহলে বড় ধরনের প্রশ্নের উদ্রেক করছে।
Leave a Reply