
দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে মা ও দুই সন্তানের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় স্বামীসহ তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। ১৮ অক্টোবর রোববার দুপুর আড়াইটা থেকে সন্ধ্যার মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে উপজেলার অমরপুর ইউনিয়নের জুগির ডাঙ্গা মাঠের পাশে মোস্তফাপুর বালুপাড়ায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার সংবাদ পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আলামত সংগ্রহ করে এবং মৃতদেহগুলো উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। সোমবার দুপুরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশগুলো দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সোমবার দুপরে ময়না তদন্তের জন্য লাশ দিমেক হাসপাতালে প্রেরণ করেছে। শিশু দুটিকে হত্যা করার আলামত মিললেও গৃহবধূ নিজে আত্মহত্যা করেছে নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে, শিশু দুটিকে কে হত্যা করেছে- এ রহস্য রোববার দিবাগত রাত ২টা পর্যন্ত উন্মোচন করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টিসহ শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ওই দম্পতির এক ছেলে সাফায়াত হোসেন (২) ও এক মেয়ে রাইফা জুরাইনা (৯ মাস) নামে দুটি শিশু সন্তানের লাশ ঘরের বিছানায় পড়ে ছিল ও স্ত্রীর লাশ ঘরের মেঝেতে শোয়ানো ছিল। বর্তমানে ঢাকায় থাকলেও ছুটিতে এসে গত ১৭ অক্টোবর শনিবার এই বাড়িতেই ছিলাম।
নিহত গৃহবধূর পিতা খাইরুল ইসলাম বাদী হয়ে সোমবার দুপুরে চিরিরবন্দর থানায় তিনজনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে স্বামী শাকিল হোসেন নিজেই সন্তানসহ স্ত্রীকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে পুলিশি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনায় ওই মৃত গৃহবধূর পিতা খাইরুল ইসলাম সোমবার দুপুর ১২টায় বাদী হয়ে চিরিরবন্দর থানায় ৩ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামল করেন। সরজমিনে গিয়ে জানা গেছে, মোস্তফাপুর বালুপাড়ার মাহতাব উদ্দিনের ছেলে শাকিল হোসেনের (২৬) সঙ্গে পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ি এলাকার খাইরুল ইসলামের মেয়ে স্বর্ণা বেগমের (২০) সঙ্গে গত সাড়ে ৩ বছর পূর্বে প্রেমের সূত্র ধরে বিয়ে হয়। মৃত গৃহবধূর আপন বড় ভাই ও শাকিলের আপন ভগ্নিপতি শাহানুর সজীব বলেন, আমি বিয়ের পর হতে ৬ বছর এই বাড়িতে পাশাপাশি লাগোয়া ঘরে থাকতাম। সংবাদ পেয়ে দ্রুত জামাইয়ের বাড়িতে আসি।
ঘটনাস্থল ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় পুলিশ জানিয়েছে
নিহত স্বর্ণার স্বামী শাকিল হোসেন (২৬), শ্বশুর মাহাতাব উদ্দিন (৫০) এবং শাশুড়ি রহমত আরা তারা বিবিকে (৪২) পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আনোয়ার হোসেন এই ঘটনাটিকে একটি হৃদয় বিদারক উল্লেখ করে জানান, সিআইডির ক্রাইম সিন বিশেষজ্ঞসহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শাকিল অটো চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন এবং মাদক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে দম্পতির মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। স্বামী মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকা, মাদকসেবন করা নিয়ে মাঝেমধ্যে স্বামী-স্ত্রীর বাগবিতন্ডাসহ টুকটাক ঝগড়া-বিবাদ থাকত। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে স্বামী শাকিল অটো চালাতেন। স্থানীয় ইউপি সদস্য নুর আমিন শাহ বলেন, তাদের পারিবারিক কলহ ছিল না।
শাকিলের দাবি, ঘটনার দিন দুপুরে তিনি কাজে বেরিয়ে যাওয়ার সময় স্ত্রী বাবার বাড়ি যেতে চাইলে তিনি পরের দিন যেতে বলেন।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পেয়ে তিনি তা ভেঙে ঘরে ঢুকে স্ত্রী ও সন্তানদের মৃত অবস্থায় পান। অন্যদিকে শ্বশুরের দাবি, তিনি কাজ থেকে ফিরে সাড়া না পেয়ে টিনের বেড়া ভেঙে ঘরে প্রবেশ করেন। নিহতের মায়ের অভিযোগ, তিন মাস আগেই মেয়ে তাকে জানিয়েছিল যে জামাই নেশাগ্রস্ত। সন্ধ্য়ায় বাড়ি ফিরে অনেক ডাকাডাকি করে ঘরের দরজা না খোলায় দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে আবছা আলোয় স্ত্রীকে ঝুলন্ত ও সন্তান দুটোকে মরে পড়ে থাকতে দেখি। ভাত খাওয়ার সময় ছেলের বউ, নাতি-নাতনি কারো কোনো সাড়া না পাওয়ায় অনেক ডাকাডাকি করি। চিৎকার চেঁচামেচিতে প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসে ও আমার স্ত্রী নাতি-নাতনি দুটোকে কোলে নিয়ে কান্না শুরু করে।
ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ কিছু লেখা উদ্ধার করেছে যেখানে আত্মহত্যার ইঙ্গিত ছিল এবং সন্তানদের পুলিশের কাছে না দেওয়ার অনুরোধ ছিল। তবে প্রকৃত ঘটনা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড নাকি অন্য কিছু, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার জেদান আল মুসা। চিরিরবন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ মাহমুদুন নবী জানান, সংবাদ পাওয়ার পরপরই এলাকাটির পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল রাতের দিকে ঘটনাস্থলে এসে কাজ শুরু করে। আইনানুগ পরবর্তী ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
Leave a Reply