ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন ঘিরে স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। আগামী ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মধ্যে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে ভোটারদের মনোযোগ এখন এই দুই দলের দিকে। নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও রাষ্ট্রপতির ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমীন (ধানের শীষ)। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা)। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আব্দুল আলীম নিজামী (বটগাছ) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব) নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। বালিয়া বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়।
দীর্ঘদিন ধরে এই আসনটি আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। বিগত ১১টি জাতীয় নির্বাচনে সাতবার আওয়ামী লীগ, চারবার বিএনপি এবং একবার জাতীয় পার্টির প্রার্থী জয়ী হন। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আদলে এখানে নতুন মেরুকরণ হয়েছে। আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ১১ হাজার ৬২৯ জন। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের তথ্য অনুযায়ী, এই আসনে সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি, যা নির্বাচনের ফলাফলে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
নির্বাচনী এলাকায় হিন্দু-অধ্যুষিত কেন্দ্রগুলোতে দুই দলেরই বাড়তি নজর রয়েছে। দক্ষিণ বঠিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার ৩ হাজার ১৪৯ জন, যাদের অধিকাংশই সংখ্যালঘু। গত নির্বাচনে এই কেন্দ্রে ধানের শীষ ১ হাজার ৮৭৬টি ও দাঁড়িপাল্লা ৫০৯টি ভোট পেয়েছিল। এছাড়া ফাড়াবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়ে ৩ হাজার ৭৫৯ ভোটারের প্রায় ৮০ শতাংশই হিন্দু সম্প্রদায়ের, যেখানে ধানের শীষ ২ হাজার ১৯৬ ভোট এবং দাঁড়িপাল্লা ৪৭৬ ভোট পায়। রাংরাই পুকুর শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ২ হাজার ৩০ জন ভোটারের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১ হাজার ৩৫৩ ভোট পান, যেখানে দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছিলেন ২২৯ ভোট। বিএনপি গত নির্বাচনের এই ফলাফল ধরে রাখতে মরিয়া, আর জামায়াত চায় সেসব কেন্দ্রে নিজেদের ভোট ব্যাংক বাড়াতে। স্থানীয়দের হিসাবে, কেন্দ্র দুটির মোট ভোটারের প্রায় ৮০ শতাংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ঠাকুরগাঁও জেলার সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কুমার গুপ্ত জানান, জাতীয় নির্বাচনের মতো উপনির্বাচনেও সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে একধরনের শঙ্কা কাজ করে। ভোটের পরে যেন তারা ভীতি বা হামলার মুখে না পড়েন, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন সংখ্যালঘু ভোটারদের আশ্বস্ত করে বলেন, তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশে বড় হয়েছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, তাঁর শরীরে রক্ত থাকা অবস্থায় তিনি কখনোই তাদের ক্ষতি হতে দেবেন না। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন ২০২৪ সালের আগস্টের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, সেই সময়েও তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে ছিলেন। তিনি বিজয়ী হলে অতীতের যেকোনো হামলার ঘটনার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের আগস্টে হিন্দু ভাই-বোনদের ওপর যখন হামলা হয়েছিল, সে সময় আমরা তাঁদের পাশে ছিলাম। সড়কের পাশে গোটা কয়েক রিকশা ভ্যান নিয়ে অপেক্ষায় চালকেরা। তাঁদের একজন বললেন, ‘তোমরা যাই কহ, ধানের শীষই জিতিবে। পাশ থেকে একজন বৃদ্ধ বললেন, ‘দাঁড়িপাল্লাক ফেলায় দেছেন। তাঁদের কথা শুনে হরেক চন্দ্র বললেন, ‘এইঠে জিতিবা গেলে হামারলার ভোট নাগিবেই।’।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উপনির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম জানান, ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে। ভোট গ্রহণের দিন ছাড়াও নির্বাচন পরবর্তী সময়েও এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।
Leave a Reply