সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীর দুটি বড় বালুমহালের দখল দরপত্র ছাড়াই স্থানীয় এক বিএনপি নেতাকে বুঝিয়ে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। সোমবার বিকেলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ আদেশে ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ হিসেবে দেখিয়ে তাকে এই মহালগুলোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। দখল বুঝে নেওয়া ওই নেতার নাম নাছির মিয়া, যিনি দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। আমরা যা করেছি, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাতেই করেছি।’।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তাপস শীল। তিনি জানান, ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, নিয়ম মেনেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের আদেশ অনুযায়ী, নাছির মিয়াকে আগামী ২০২৭ সালের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত এই নদী থেকে বালু তোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এতে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভূমি মন্ত্রণালয় আমাদের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। ২২ সেপ্টেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয় এক আদেশে শুধু নাছির মিয়াকে দুটি মহাল থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেয়।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, গত তিন বছরের গড় বাজারমূল্যের ওপর ১২ শতাংশ অতিরিক্ত ফি ধরে বালুমহাল দুটির অবশিষ্ট সময়ের জন্য রাজস্ব ধরা হয়েছে ৪২ কোটি ৬৬ লাখ ৩৬ হাজার ৪২২ টাকা। তবে স্থানীয়ভাবে এ ধরনের বিশেষ আদেশের সমালোচনা উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ বলছেন, বালুমহাল ব্যবস্থাপনা নীতি অনুযায়ী সাধারণত প্রকাশ্য দরপত্র আহ্বান বা খাস আদায়ের মাধ্যমে ইজারা প্রদান করা নিয়ম, যা এক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি।
তথ্য অনুযায়ী, ১৪৩২ বাংলা সনের জন্য যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহাল ১০৮ কোটি টাকায় ইজারা নিয়েছিলেন জিনান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শাহ রুবেল আহমদ এবং নাছির মিয়া। আইনি জটিলতায় পাঁচ মাস দেরিতে দখল পাওয়ার পর, তারা মেয়াদ বাড়ানোর দাবিতে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন। আপিলের প্রেক্ষিতে গত ১৩ সেপ্টেম্বর আদালত তাদের আবেদন নাকচ করলে প্রশাসন বালু উত্তোলন বন্ধ ঘোষণা করে। এরপর নতুন করে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা স্থগিত করা হয়। গত ১৩ সেপ্টেম্বর আপিলের শুনানি শেষে রিটকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত নয় মর্মে আদেশ হয়। পরে চলতি ১৪৩৩ বাংলা সনের বাকি সময়ের জন্য খাস আদায়ে ইজারা নিয়োগের উদ্যোগ নেয় জেলা প্রশাসন। এ জন্য ১৭ সেপ্টেম্বর জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা আহ্বান করা হলেও পরে তা স্থগিত হয়। আদালত তাঁদের পক্ষে আদেশ দেন।
পরবর্তীতে ইজারাদাররা নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত দাবি করে মন্ত্রণালয়ের শরণাপন্ন হন।
এরই মধ্যে শাহ রুবেল আহমদ গত ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে রিট করলে মন্ত্রণালয় ওই আদেশ তিন মাসের জন্য স্থগিত করে, যা পরে দুই পক্ষের সমঝোতায় প্রত্যাহার করা হয়। এরপর গত ১৫ অক্টোবর অপর সাবেক ইজারাদার রতন মিয়া একই বিষয়ে রিট দায়ের করলে গত রোববার তার কার্যকারিতা স্থগিত হয়। সব আইনি জটিলতার পর মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ নির্দেশনায় প্রশাসন নাছির মিয়াকে সোমবার বালুমহালের দখল বুঝিয়ে দিল।
Leave a Reply