পরিবার ও সমাজের প্রতিকূলতাকে জয় করে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মিতু আক্তার। জীবনের কঠিনতম সময়ে সংসারের ভাঙন ও আর্থিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি হার মানেননি। মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের মেয়ে মিতুর জীবনসংগ্রাম শুরু হয় ২০১৯ সালে, যখন ব্যক্তিগত জীবনে এক বড় ধরনের ঝড়ের মুখে পড়ে বিচ্ছেদের পর তিনি ছয় মাসের সন্তান সাফাত নূর আলিফকে নিয়ে একা হয়ে পড়েন। কোনো উচ্চশিক্ষার সনদ না থাকা এবং পারিপার্শ্বিক কটুকথার মাঝে নিজের ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই ছিল তাঁর প্রধান চ্যালেঞ্জ। পরিবার, সমাজ কিংবা জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতি কোনো কিছুই মানুষের স্বপ্ন ও ইচ্ছাশক্তিকে দমাতে পারে না—যদি থাকে ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য জেদ। তেমনই এক সংগ্রামী নারী মিতু আক্তার। জীবনের নানা ঝড়ে যাঁর তরি প্রায় ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, কিন্তু তিনি হার না মেনে নিজের মেধা, পরিশ্রম ও সাহসিকতায় লিখেছেন এক নতুন বিজয়ের উপাখ্যান। নদীর তীরের শান্ত স্নিগ্ধ এক জনপদ মুন্সিগঞ্জের লৌহজং, আর সেখানকারই একটি চেনা গ্রাম বেজগাঁও। বাবা মো. আবুল হোসেন শেখ, পেশায় একজন সার্ভেয়ার বা আমিন। মানুষের জমির মাপজোখ আর হিসাব-নিকাশ করেই তাঁর সারা দিন কাটত। মিতু আক্তারের ভাই-বোন মিলিয়ে মোট চারজন—তিন ভাই আর সবার ছোট একমাত্র বোন মিতু আক্তার। ভাই-বোনদের আদুরে স্নেহে আর মা-বাবার ছায়ায় এভাবেই কেটেছিল তাঁর শৈশব ও কৈশোর। পারিবারিক টানাপোড়েন এবং একপর্যায়ে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তাগিদে তিনি ইন্টারনেটে সম্মানজনক কাজের খোঁজ শুরু করেন—যে কাজ ঘরে বসেই তাঁকে আর্থিক সচ্ছলতা ও আত্মমর্যাদা এনে দেবে। মিতু আবারও গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হন।
প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করার তাগিদে মিতু ইন্টারনেটের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজছিলেন। ২০২০ সালের শেষের দিকে ভাইয়ের কাছ থেকে চেয়ে আনা একটি পুরোনো ভাঙা ল্যাপটপ দিয়েই তিনি গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ শেখা শুরু করেন। তবে শ্বশুরবাড়ি থেকে ফেরার পথে সেটি আবার ভেঙে গেলে তিনি নতুন করে হতাশায় পড়েন। সে সময় মায়ের কানের দুল বিক্রির টাকায় ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের কোর্স করে নতুনভাবে পথচলা শুরু করেন তিনি। মিতু জানান, সেদিন মা ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ও ঢাল, যার ঋণ তিনি নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে পরে শোধ করেছেন। আর মা শিউলি বেগম ছিলেন পুরো পরিবারের মায়াবী ছায়া। মাকে বোঝালাম যে আমাকে কোনোভাবে টাকার ব্যবস্থা করে দিলে আমি ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের একটি কোর্স করব। মা আমার কথায় কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজের কানের দুল বিক্রি করে দিলেন। সেই টাকা আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘যেদিন আয় করবে, সেদিন আমাকে আবার বানিয়ে দিয়ো।
ধৈর্য ও অদম্য চেষ্টায় তিনি এসইও (এসইও) এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে দক্ষতা অর্জন করেন। ফাইভআরে এক ইতালীয় গ্রাহকের কাছ থেকে ১২০ ডলারের প্রথম কাজ পাওয়ার পর তাঁর সাফল্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে। এরপর তিনি ফাইভআরে লেভেল ২ ফ্রিল্যান্সার এবং আপওয়র্য়াকে টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। সময়ের সঙ্গে কাজের পরিধি বেড়ে যাওয়ায় তিনি গড়ে তোলেন ‘বি মার্কেটিং এজেন্সি’। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে ১০ জন তরুণ-তরুণী রিমোটলি কাজ করছেন, যা তাঁর নিজের ভাগ্য বদলানোর পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের পথ খুলে দিয়েছে। শূন্য থেকে শুরু করে আজ তিনি কেবল নিজের ভাগ্যই বদলাননি, হয়ে উঠেছেন আরও ১০ জন তরুণ–তরুণীর অনুপ্রেরণা। কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের জোরে তিনি আউটসোর্সিং কাজ দেওয়া–নেওয়ার ওয়েবসাইট ফাইভআরে এক ইতালীয় গ্রাহকের কাছ থেকে প্রথম ১২০ ডলারের কাজ পান।
শিক্ষাজীবনের অসম্পূর্ণ অধ্যায়টি তিনি ফেলে রাখেননি। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন এবং বর্তমানে বিবিএ করছেন। ব্যক্তিগত অর্জনের মধ্যে নিজের উপার্জিত টাকায় স্কুটি কেনা এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স অর্জনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পর্দা রক্ষা করেও সফলভাবে কাজ করা সম্ভব। তিনি নিজের জমানো অর্থে জমি কিনেছেন এবং দ্রুতই বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করছেন। অবশেষে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।
নিজের সাফল্যের পেছনের রহস্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিতু বলেন, ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো পরিবর্তনশীল ক্ষেত্রে টিকে থাকতে হলে নিয়মিত নতুন কৌশল শেখা ও প্রয়োগ করা অপরিহার্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সার্চ ইঞ্জিনের কার্যকর ব্যবহারে তরুণরা পেশাগতভাবে অনেক দূর এগোতে পারে। ক্রিয়েটিভ আইটিতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি নিজের দক্ষতা শাণিত করেছেন বলে জানান। আমাদের সমাজে অনেক নারীই প্রতিনিয়ত নীরবে লড়াই করে যান।
নিজের লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা থেকে এখন তিনি পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছেন। যারা পারিবারিক বা সামাজিক বাধার কারণে মতামত প্রকাশে দ্বিধাবোধ করেন, তাদের ফ্রিল্যান্সিং দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করাই এখন মিতুর মূল লক্ষ্য। ২০১৬ সালের নভেম্বরে বিয়ে ও ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর ছেলের জন্মের পর যে কঠিন পথ তিনি পাড়ি দিয়েছেন, তা আজ অনেকের জন্যই অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়ের পালাবদলে ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর কোলজুড়ে আসে এক নতুন আলো—একমাত্র পুত্রসন্তান, সাফাত নূর আলিফ।
Leave a Reply