আর্মেনিয়ার ইয়েরেভানে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সনদের পক্ষসমূহের সপ্তদশ সম্মেলন বা সিবিডি কপ১৭-এর উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ও বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের প্রধান ড. ফাহমিদা খানম মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আরাগাৎস প্লেনারি হলে দেশের পক্ষে এ সংক্রান্ত বিবৃতি প্রদান করেন। তিনি জানান, দেশের স্থলভাগ, উপকূলীয় অঞ্চল এবং অভ্যন্তরীণ জলাশয় মিলিয়ে প্রায় ১৪ হাজার প্রজাতির বৈচিত্র্যময় প্রাণ-প্রকৃতি বিদ্যমান, যা বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, ম্যানগ্রোভ ও জলাভূমির অবক্ষয় সামাজিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীও এসব সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনের প্রতিনিধি, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।
ড. ফাহমিদা খানম বলেন, কুনমিং-মন্ট্রিয়ল বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামো বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ কাঠামোর আওতায় দেশ ইতোমধ্যে ২৩টি জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও ১০৭টি নির্দিষ্ট কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এছাড়া ২০৩১ সালের মধ্যে বাস্তুসংস্থানভিত্তিক পদ্ধতিতে ২৫ কোটি নতুন গাছ রোপণ ও পরিচর্যার একটি महत्वाকাঙ্ক্ষী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে বর্তমান সরকার। নাগোয়া প্রটোকল বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তার প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি সমন্বয়ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করছে, তবে এই প্রক্রিয়ায় কারিগরি ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৩ সাল থেকে নাগোয়া প্রটোকল বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশ বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সরকারি সমন্বয়ব্যবস্থা পর্যালোচনা ও পুনর্বিন্যাস করছে।
বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, জীববৈচিত্র্য সনদের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদের শর্ত অনুযায়ী উন্নত দেশগুলোর উচিত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তির হস্তান্তর ত্বরান্বিত করা। বাংলাদেশ বিশেষভাবে জিনগত সম্পদসংক্রান্ত ডিজিটাল সিকোয়েন্স তথ্য (ডিএসআই) এবং সিনথেটিক বায়োলজির মতো আধুনিক ক্ষেত্রে সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়। ড. খানম জানান, বৈজ্ঞানিক তথ্য উৎপাদন ও সংরক্ষিত এলাকা সম্প্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে সহায়তা দরকার, যা স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় হওয়া আবশ্যক।
আঞ্চলিক ও আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা আরও জোরদার করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য তহবিল বরাদ্দ বৃদ্ধিরও তাগিদ দিয়েছে বাংলাদেশ। সেই সাথে ভূমি অবক্ষয় রোধ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং অন্যান্য বহুপক্ষীয় পরিবেশ চুক্তির মধ্যে সমন্বয় সাধনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে জীবনযাত্রার যে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জনে বাংলাদেশ সব পক্ষের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে। ইয়েরেভানে বিশ্বনেতাদের এই সম্মেলন বিদ্যমান অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন ড. ফাহমিদা খানম। জীববৈচিত্র্যকে বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, সংরক্ষিত এলাকা ও অন্যান্য কার্যকর এলাকাভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতি শনাক্তকরণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ উদ্যোগ জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় জলবায়ু এবং মানুষের কল্যাণে অবদান রাখবে।
Leave a Reply