পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের বাধার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের ২৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক। গত ২৪ অক্টোবর বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর এই অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে, যেখানে প্রায় ১৫ ঘণ্টা ধরে তাঁর দাফন আটকে রাখা হয়। বিবৃতিদাতারা এই ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয় উল্লেখ করে এর কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁরা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়া কোনো ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা কি না, তা যাচাইয়ের একমাত্র ক্ষমতা রাষ্ট্রের। স্বাধীনতার বিরোধিতা করা কোনো রাজনৈতিক দলের এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার নৈতিক বা আইনি অধিকার নেই। তাঁরা বলেছেন, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনমনে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের সঞ্চার করছে। সেখানেই ২৪ অক্টোবর তিনি মারা যান। স্বাধীনতার বিরোধিতা করা দল কোনো পর্যায়ে ঠিক করে দিতে পারে না কে মুক্তিযোদ্ধা, আর কে নন।
বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়, পিরোজপুরের শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা মানিক পশারী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে গোপালগঞ্জে মেয়ের বাসায় অবস্থান করছিলেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। রাষ্ট্রীয় নিয়ম মেনে তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থানীয় জামায়াত কর্মীরা মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে দাফনে বাধা দেয়। এমনকি প্রথমবার কবর খোঁড়ার পর তারা সেটি ভরাট করে দেয়। পরবর্তীতে রাত আনুমানিক ২টার দিকে গ্রাম পুলিশের সহায়তায় মোবাইল ফোনের আলোয় পুনরায় কবর খুঁড়ে পুলিশি নিরাপত্তায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে পিরোজপুর পুলিশ লাইনসে রাষ্ট্রীয়ভাবে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী ব্যক্তিরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, ১৯৭১ সালে যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ দালিলিকভাবে প্রমাণিত। তারা আজ পর্যন্ত এসব অপরাধের দায় স্বীকার বা প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। দাফনের মতো একটি ধর্মীয় ও মানবিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে তারা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁদের ভাষ্যমতে, মৃত ব্যক্তির যথাযথ মর্যাদায় শেষ বিদায় জানানো সব ধর্মের অনুশাসন। এই মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাঁরা জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
এক বিবৃতিতে তারা বলেন, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান বা অতীতের ভূমিকার কারণে জানাজা ও দাফনে বাধা সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মানিক পশারীর প্রতি যে অসম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে, তা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সামাজিক শৃঙ্খলা সম্পর্কে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। যে রাজনৈতিক দল অতীতে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, তাদের কাছ থেকে এমন কর্মকাণ্ড মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য একটি অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষবিদায়কে ঘিরে এমন পরিস্থিতি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন ও উদ্বেগের জন্ম দেয়। রাষ্ট্র যদি কখনো প্রয়োজন মনে করে তবে সে তা যাচাই-বাছাই করতে পারে। বিরোধী দলে থাকতেই কবর দিতে বাধা দিচ্ছে, রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে গেলে কী করবে: তাসনিম জারা।
এই প্রতিবাদী বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন সুলতানা কামাল, রাশেদা কে চৌধুরী, খুশী কবির, জেড আই খান পান্না, ইফতেখারুজ্জামান, শাহীন আনাম, রেহনুমা আহমেদ, শহিদুল আলম, স্বপন আদনান, শামসুল হুদা, তবারক হোসেন, সামিনা লুৎফা, সুমাইয়া খায়ের, তানজীমউদ্দিন খান, রোবায়েত ফেরদৌস, জোবাইদা নাসরীন, নোভা আহমেদ, জাকির হোসেন, সুব্রত চৌধুরী, সালমা আলী, মো. নুর খান, পাভেল পার্থ, রোজিনা বেগম, সাইদুর রহমান, সাঈদ আহমেদ, দীপায়ন খীসা, হানা শামস আহমেদ ও মুক্তাশ্রী চাকমা।
Leave a Reply