যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে করপোরেট রাজনৈতিক অনুদান অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। নির্বাচনী অর্থের ওপর নজরদারি করা সংগঠন ‘পাবলিক সিটিজেন’-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মাত্র ১৮ মাসে বিভিন্ন কোম্পানি মার্কিন রাজনৈতিক প্রচারে ৬৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছে। এই অংকটি ২০২৪ সালের পুরো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী পর্বে কোম্পানিগুলোর মোট অনুদানের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি।
নির্বাচনী প্রচারের এই অর্থপ্রবাহের পেছনে মূল ভূমিকা রাখছে ক্রিপ্টোকারেন্সি, অনলাইন স্পোর্টস বেটিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো। কেবল এই তিনটি খাত থেকেই মোট অনুদানের অর্ধেকের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৩৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার এসেছে। এর মধ্যে অনলাইন স্পোর্টস বেটিং কোম্পানিগুলো—যেমন ড্রাফটকিংস, ফ্যানডুয়েল, ফ্যানাটিকস ও বেট৩৬৫—দ্বিতীয় প্রান্তিকে ‘উইন ফর আমেরিকা’ নামক সুপার পিএসিতে ২ কোটি ৯০ লাখ ডলার প্রদান করেছে। সব মিলিয়ে স্পোর্টস বেটিং খাতের মোট অনুদান দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারে।
এআই খাতের কোম্পানিগুলোর ভূমিকাও বেশ জোরালো। চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআই-সমর্থিত সুপার পিএসি ‘লিডিং দ্য ফিউচার’ এ পর্যন্ত ৫ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে, যার ফলে এআই খাতে মোট অনুদানের পরিমাণ ৬ কোটি ২০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই পিএসি অনুদান ও প্রতিশ্রুত অর্থ মিলিয়ে মোট ১৪ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে। যদিও ওপেনএআই বরাবরই দাবি করে আসছে যে, কোনো বাইরের রাজনৈতিক সংগঠন তাদের প্রতিনিধিত্ব করে না।
ব্যক্তিগত পর্যায়েও বড় ধরনের অনুদান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক এ পর্যন্ত ফেডারেল নির্বাচনে ৯ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছেন। একইভাবে গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন ক্যালিফোর্নিয়ায় সম্পদ করসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ১০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন। এছাড়া উৎপাদন খাতের জায়ান্ট কোচ ইনকরপোরেটেড জুনে ‘আমেরিকানস ফর প্রসপারিটি অ্যাকশন’-কে দুই কোটি ডলার দিয়েছে।
তামাক ও গাঁজা খাতের কোম্পানিগুলোও নির্বাচনী লড়াইয়ে বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগ করেছে। রেনল্ডস আমেরিকান তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ট্রাম্পের সুপার পিএসি ‘এমএজিএ ইনকরপোরেটেড’-কে ৫০ লাখ ডলার দিয়েছে। অন্যদিকে কারিউলিফ ও ট্রুলিভসহ ছয়টি গাঁজা প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘আমেরিকা ফার্স্ট অ্যাগ্রিকালচার অ্যাকশন ইনকরপোরেটেড’-কে ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার প্রদান করেছে।
পাবলিক সিটিজেনের গবেষণা পরিচালক রিক ক্লেপুল এই প্রবণতাকে ‘সতর্কসংকেত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, কার্যকর গণতন্ত্রের স্বার্থে করপোরেট অর্থের এই প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তবে ইনস্টিটিউট ফর ফ্রি স্পিচের ভাইস প্রেসিডেন্ট টম গ্যারেট ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি একে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সব মার্কিন নাগরিকের রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার অধিকার রয়েছে।
এই হিসাবের বাইরেও বিপুল পরিমাণ অর্থ নির্বাচনী প্রচারের আড়ালে রয়ে গেছে। তথাকথিত ‘ডার্ক মানি’ সংগঠনগুলোর মাধ্যমে আসা অনুদান এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত নয়, কারণ এসব সংগঠনের দাতাদের নাম প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক নয়। এছাড়া অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের নির্বাচনে ব্যয় করা অর্থও এখানে নেই। উদাহরণস্বরূপ, মেটা তাদের অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের প্রচারণার জন্য ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার আলাদা করে রেখেছে, যা এই পরিসংখ্যানে যুক্ত হয়নি।
ক্লড এআইয়ের নির্মাতা অ্যানথ্রপিক ‘পাবলিক ফার্স্ট অ্যাকশন’ নামক একটি সংগঠনকে চার কোটি ডলার দিয়েছে। সংগঠনটির মুখপাত্রের দাবি, তারা মধ্যবর্তী নির্বাচনে ব্যয়ের জন্য মোট ১০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে এবং তাদের মূল লক্ষ্য হলো এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় ভোক্তা সুরক্ষা আইন পাসে কংগ্রেসকে উৎসাহিত করা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নেট সিলভারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আসন্ন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সিনেট জয়ের সম্ভাবনা ৫৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার সম্ভাবনা ৮৪ শতাংশ। এই প্রেক্ষাপটে রিপাবলিকান সমর্থক পিএসিগুলোতে অনুদানের গতি আরও বাড়ছে।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রাজনৈতিক ব্যয়ের ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোম্পানিগুলো মোট ১৭০ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছে। এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এসেছে বর্তমান নির্বাচনী পর্বে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের শেষ দুই মাসে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই আরও তীব্র হলে এই অনুদানের পরিমাণ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নির্বাচনে করপোরেট অর্থ ব্যয়ের বিরোধিতা করে আসা ভোক্তা অধিকার সংগঠন পাবলিক সিটিজেন ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত সংগঠন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তারা ফেডারেল ইলেকশন কমিশনের (এফইসি) নথি বিশ্লেষণ করেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কোম্পানির দেওয়া অনুদান আলাদাভাবে শনাক্ত করতে তথ্যগুলো হাতে ধরে যাচাই করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কার্যকর গণতন্ত্রের স্বার্থে এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর ফলে কোম্পানি ও ধনী ব্যক্তিরা স্বাধীন রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে কত অর্থ দিতে পারবেন, তার সীমা নেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আগামী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রিপাবলিকানরা যখন কঠিন লড়াইয়ের মুখে, তখনই এই অর্থপ্রবাহ বাড়ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ বিষয়ে কোম্পানির বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তারা মন্তব্য করেনি।
Leave a Reply