নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে দেশের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেলেও, সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সোমবার (২৪ আগস্ট) সকালে রাজধানীতে আয়োজিত ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক মিডিয়া সংলাপে সংস্থাটি তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে।
সংলাপে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমান সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে নানা কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এবং সেই সময়ে বৈশ্বিক পরিস্থিতিও অনুকূলে ছিল না। সরকার বারবারই খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নেওয়ার কথা উল্লেখ করছে। তবে সংস্কার কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সমন্বিত কোনো কর্মপরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান নয়। সিপিডি নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি ও গৃহীত পদক্ষেপগুলো মূল্যায়নের জন্য প্রায় ৩৬২টি উদ্যোগের একটি তালিকা তৈরি করেছে, যার মধ্যে সুশাসনের ক্ষেত্রে ১০৫টি ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করা হয়েছে। ড. ভট্টাচার্য উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা সত্ত্বেও মব সহিংসতা, নারী, শিশু ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার মতো ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের চিত্র তুলে ধরে সিপিডি জানায়, চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। অথচ সরকারের মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া চলতি হিসাবের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত বর্তমানে ৬০০ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতিতে পরিণত হয়েছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে; এটি ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের তিনটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক তাদের কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।
নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছে সিপিডি। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে সিইপিএ চুক্তি স্বাক্ষর, বিডা-বেজা-পিপিপিএ একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ গঠন এবং স্টার্টআপ ফান্ড চালু করা। এছাড়া ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের নাগরিকদের জন্য মেট্রো ও ট্রেন ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড়, কৃষিঋণের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ ও সুদ মওকুফ এবং নারী পরিচালিত ‘পিংক’ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্যাংক খাতের সংস্কারে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন এবং পাঁচটি অকার্যকর এনবিএফআইয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬ প্রয়োগের উদ্যোগকেও সংস্থাটি স্বাগত জানিয়েছে।
ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে সিপিডি সরকারকে বেশ কিছু সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদের জন্য একটি ‘কোর বাজেট’ প্রণয়ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ জাতীয় সংসদে বেতন কাঠামো, ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ খাত এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়ে একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে একটি সমন্বিত দলিল তৈরি না করায় এখন বিভিন্ন পদক্ষেপ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করা কঠিন হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নতুন সরকারের কাছে দুটি বড় প্রত্যাশা ছিল-অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। চাকরির আরও তথ্য: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর প্রত্যাশা থাকলেও সেখানে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানও উপস্থিত ছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইশতেহারে যেসব কমিশনের কথা বলা হয়েছিল, সেগুলোরও অনেকগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি।
Leave a Reply