যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার সম্পর্ককে দীর্ঘদিন ধরে ‘ইস্পাতকঠিন’ বলে বর্ণনা করে আসছেন ইসরায়েলপন্থী মার্কিন রাজনীতিকরা। এই পরিভাষাটি দিয়ে তারা ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে অটুট বন্ধুত্বের দাবি জানান। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সফর ও তাকে ঘিরে বৈশ্বিক প্রতিক্রয়া এই সম্পর্কে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গাজায় চলমান পরিস্থিতির জেরে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং এমনকি খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ইসরায়েলের গ্রহণযোগ্যতা আগের চেয়ে অনেকটাই কমেছে। এ যেন অনেকটা ‘দোস্ত দোস্ত না রাহা’-কাহিনি। সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বাড়ি এসে তার দেখা তো পাওয়া গেলই না, এমনকি কথা বলার সুযোগও মিললো না। উল্টো দেখা গেল—‘সবচেয়ে বড় শত্রুর সবচেয়ে বড় বন্ধুর’ সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দহরম-মহরম। গাজার ধ্বংসস্তূপে অগণিত মরদেহ, সঙ্গে অবিস্ফোরিত বোমা। আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া ও পানামার রাষ্ট্রপতিদের সঙ্গে দেখা করেন।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ড ছিল বেশ অস্বাভাবিক ও সংক্ষিপ্ত। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, এ বছর নিউইয়র্কে তিনি ৮ ঘণ্টারও কম সময় অবস্থান করতে পারেন। অথচ গত বছর তার সফরটি ছিল সপ্তাহব্যাপী। যদিও নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে ৯ দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা জানানো হয়েছিল, যার মধ্যে পাঁচটি লাতিন আমেরিকার দেশ, কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো বৈঠকের খবর পাওয়া যায়নি। টাইমস অব ইসরায়েলের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ সেপ্টেম্বর সকালে পৌঁছেই দুপুরে তিনি জাতিসংঘের অধিবেশনে ভাষণ দেন। এর আগে নেতানিয়াহু মোট ১৪ বার এই মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন, তবে এবারের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দিতে এসে ‘বিশ্বের সবচেয়ে ঘৃণিত নেতা’র খেতাব পাওয়া ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে যেন ‘মুখ লুকিয়ে পালাতে’ হলো। গাজা যুদ্ধ ও পশ্চিমতীরে বসতিস্থাপন বাড়ানোয় দীর্ঘদিনের মিত্র ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কে চিড় ধরায় নেতানিয়াহু লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার পথ খুঁজছেন।
নেতানিয়াহু যখন ভাষণ দিতে মঞ্চে ওঠেন, তখন অনেক দেশের প্রতিনিধিরা অধিবেশনস্থল ত্যাগ করেন। সভার সভাপতিদের আসনে থাকা প্রতিনিধিরাও সে সময় অনুপস্থিত ছিলেন। গাজায় সংঘাতের প্রতিবাদে কূটনীতিকদের এই ‘ওয়াকআউট’ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার ভাষণের আগেই সভাকক্ষ অনেকটাই খালি হয়ে যায়। শুধু কূটনীতিকরাই নন, বরং নিউইয়র্কে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন সাধারণ মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা। অস্কার বিজয়ী শিল্পী থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ—অনেকেই এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।
বিক্ষোভকারীদের হাতে ‘ফিলিস্তিনে গণহত্যা বন্ধ করো’ ও ‘ইসরায়েলে অস্ত্র পাঠানো বন্ধ করো’ লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা গেছে। এছাড়া, শতাধিক প্রতিবাদকারীকে আটকের খবরও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানিকে নেতানিয়াহু হামাসের সাথে জড়িয়ে মন্তব্য করায় বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করে। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ইহুদি সংগঠনগুলোর বড় একটি অংশও ছিল, যারা নিজেদের দাবি তুলে ধরতে গিয়ে জায়নবাদের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং ইসরায়েলি সরকারকে ‘শিশু হত্যাকারী’ হিসেবে অভিহিত করেন।
আন্তর্জাতিক আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে চলা নেতানিয়াহুর জন্য এই সফর ছিল বেশ অস্বস্তিকর। এদিকে, পিউ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের মধ্যেও ইসরায়েলের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। জুইশ ভয়েস ফর পিস অ্যাকশন-এর পরিচালক বেথ মিলারের মতে, মার্কিনিদের করের টাকা ইসরায়েলি সরকারকে দেওয়া নিয়ে এখন অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন। রাজনৈতিকভাবেও এর প্রভাব স্পষ্ট; প্রভাবশালী পত্রিকা হারেৎজ তাদের সম্পাদকীয়তে এই সংকটের দায় নেতানিয়াহুর ওপরই চাপিয়েছে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই বিচ্ছিন্নতার সুর শোনা যাচ্ছে। নাফতালি বেনেটের মতো নেতারাও স্বীকার করছেন যে ইসরায়েল তার সমর্থন হারিয়ে ফেলছে। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্প বা জেডি ভ্যান্সের মতো মার্কিন রাজনীতিকদের ইসরায়েল-নীতি নিয়ে যে পরিবর্তিত অবস্থান তৈরি হয়েছে, তা দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের এই দূরত্ব এবং নেতানিয়াহুর একক বিচ্ছিন্নতা বর্তমানে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে। একইদিনে, বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক সংবাদের শিরোনাম করে—‘নেতানিয়াহুর স্বল্পসময়ের নিউইয়র্ক সফর মার্কিন সম্পর্কের টানাপড়েনের প্রতিফলন।’।
Leave a Reply