যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অনুদানের বিষয়টি ফের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিলিয়নিয়ার বিনিয়োগকারী জর্জ সরোস এবং তার প্রতিষ্ঠিত সরোস-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই নির্বাচনী চক্রে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সুপারপ্যাক ‘ডেমোক্র্যাসি প্যাক’-এ বিশাল অংকের অর্থ বিনিয়োগ করেছে। ২০১৯ সালে জর্জ সরোসের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই সুপারপ্যাকটি চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ১০২ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি তহবিল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে জুনের শেষ নাগাদ সংস্থাটি ব্যয় করেছে প্রায় ৪২ মিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় অংকের অনুদান প্রদানকারী বা ‘মেগাডোনার’ হিসেবে সরোস পরিবারের প্রভাব দীর্ঘদিনের। এর আগে ২০০৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী জর্জ ডব্লিউ বুশের পুনর্নির্বাচনের বিরোধিতা করে বিভিন্ন সংগঠনে প্রায় ২৪ মিলিয়ন ডলার প্রদান এবং ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জন কেরির পক্ষে সরাসরি অবস্থান নেওয়ার মাধ্যমে সরোস তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ দিয়েছিলেন। ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সংস্থাটি ১০২ মিলিয়ন ডলারের বেশি সংগ্রহ করেছে। এর প্রায় অর্ধেক এসেছে সরোসের মালিকানাধীন বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান জিওসোর কর্প থেকে এবং বাকি বড় অংশ এসেছে ফান্ড ফর পলিসি রিফর্ম থেকে। এই অর্থ সরাসরি একজন বা কয়েকজন প্রার্থীর প্রচারে সীমাবদ্ধ না থেকে সিনেট, প্রতিনিধি পরিষদ ও রাজ্য পর্যায়ের নির্বাচনে সক্রিয় বিভিন্ন ডেমোক্র্যাট-সমর্থিত রাজনৈতিক সংগঠন ও নিরপেক্ষ গোষ্ঠীর কাছে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক অর্থায়নের পাশাপাশি বর্তমান জনমত জরিপগুলোও ডেমোক্র্যাটদের জন্য আশার আলো দেখাচ্ছে। ইমারসন কলেজ পোলিংয়ের পক্ষ থেকে গত ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর একটি জাতীয় জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে এক হাজার সম্ভাব্য ভোটারের মতামতের ভিত্তিতে দেখা গেছে, কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের প্রতি ৫৩ শতাংশ ভোটারের সমর্থন রয়েছে, যেখানে রিপাবলিকানরা পেয়েছে ৪২ শতাংশ সমর্থন। অর্থাৎ, এই জরিপে ডেমোক্র্যাটরা ১১ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে আছে। তবে জরিপ পরিচালনাকারীরা জানিয়েছেন, এর ত্রুটিসীমা ৩ শতাংশ পয়েন্ট হওয়ার কারণে এই ১১ পয়েন্টের ব্যবধানকে চূড়ান্ত নির্বাচনের ফলাফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে জাতীয় ‘জেনেরিক ব্যালট’ কোনো নির্দিষ্ট কংগ্রেসনাল আসনের ফল নির্দেশ করে না।
অন্য একটি জরিপে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়েছে। গত ৮ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি পরিষদীয় আসনে এক হাজার ৫২ জন সম্ভাব্য ভোটারের ওপর জরিপ চালানো হয়। সেখানে ডেমোক্র্যাটরা ৪৯ শতাংশ এবং রিপাবলিকানরা ৪৭ শতাংশ সমর্থন পেয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ৩৭টি আসনে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প গড়ে ৫ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। বর্তমান জরিপে ডেমোক্র্যাটদের ২ পয়েন্ট এগিয়ে থাকার বিষয়টিকে রাজনৈতিক বাতাবরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এই জরিপটির ত্রুটিসীমা ৩.০২ শতাংশ পয়েন্ট। ৮ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর দেশের ৩৭টি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রতিনিধি পরিষদীয় আসনের ১০৫২ সম্ভাব্য ভোটারের ওপর পরিচালিত জরিপে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ৪৯ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের ৪৭ শতাংশ পাওয়া যায়। নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে জনমত জরিপেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।
সরোস পরিবারের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নানা অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে জর্জ সরোস ও তার পুত্র অ্যালেক্স সরোসের বিরুদ্ধে সহিংস বিক্ষোভে অর্থায়নের গুরুতর অভিযোগ এনেছিলেন। এমনকি তিনি তাদের পরিচালিত ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম তদন্তের জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। যদিও সরোস ফাউন্ডেশন এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। এছাড়া, পরিবারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক সক্রিয়তা অব্যাহত রয়েছে, যার অংশ হিসেবে অ্যালেক্স সরোস ২০২৪ সালের নির্বাচনে কমলা হ্যারিসের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছিলেন। এখন পর্যন্ত সরোস পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সপক্ষে কোনো চূড়ান্ত বিচারিক রায় বা সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি। সব মিলিয়ে, বৃহৎ অংকের অর্থায়ন এবং পরিবর্তিত জনমত—এই দুইয়ের সমন্বয়ে মার্কিন রাজনীতির মেরুকরণ এখন নতুন মোড় নিয়েছে। সংস্থাটির বোর্ড চেয়ারম্যান তার ছেলে অ্যালেক্স সরোস।
Leave a Reply