ইরান যুদ্ধের অষ্টম মাসে পদার্পণ করায় মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বড় আকারে বৃদ্ধি করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের নিকটবর্তী জলসীমায় ওয়াশিংটন তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী বহর মোতায়েন করার পাশাপাশি অতিরিক্ত ৯ থেকে ১০ হাজার সেনাসদস্য পাঠাচ্ছে। চলমান এই সামরিক তৎপরতা যুদ্ধের বিস্তৃতি ঘটাবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব বিমানের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে কার্গো বিমান ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকারও পাঠানো হয়েছে।
মার্কিন সূত্র মারফত জানা গেছে, স্থানীয় সময় রবিবার সান দিয়েগো ঘাঁটি থেকে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট রণতরী বহর মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। এরপর মার্কিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটও তাদের যাত্রা শুরু করে, যেখানে দুই হাজারের বেশি মেরিন সদস্য রয়েছেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যানুসারে, নতুন এই নৌবহর ও বিভিন্ন সামরিক ইউনিট মিলিয়ে মোট ৯ থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনাসদস্য মোতায়েন হতে যাচ্ছে। নভেম্বরের শেষ নাগাদ ওই অঞ্চলে তিনটি বিমানবাহী রণতরী এবং দুটি উভচর অবতরণকারী দল উপস্থিত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আরো ৯ থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনা ও নৌসদস্য ওই অঞ্চলে যাওয়ার পথে রয়েছেন। মার্চে উপসাগরীয় অঞ্চলে আরো সেনা পাঠানোর নির্দেশ দেয় পেন্টাগন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য এর মাধ্যমে বিস্তৃত বিকল্প তৈরি হচ্ছে। নতুন মোতায়েন করা সামরিক শক্তির মধ্যে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনাসদস্য অবস্থান করছেন, যার সাথে নতুন এই বাহিনী যুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে। আল জাজিরার ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিবেদক তানিয়া নুরি জানিয়েছেন, নতুন মোতায়েনের মধ্যে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত প্রায় ৭ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের সূত্র অনুযায়ী, কূটনৈতিক আলোচনা যেদিকেই মোড় নিক না কেন, ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক বিকল্প খোলা রাখতে বদ্ধপরিকর। এমনকি ইরানের সাথে কোনো সমঝোতা হলেও বর্তমানে মোতায়েন করা এই সামরিক সম্পদ প্রত্যাহারের পরিকল্পনা নেই পেন্টাগনের। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, ট্রাম্প নতুন হামলার নির্দেশ দিলে মার্কিন বাহিনী পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক উপস্থিতির অংশ হিসেবে অন্তত ১৯টি স্থায়ী ও অস্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে, যার মধ্যে সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, জর্ডান ও মিসর উল্লেখযোগ্য। ১৯৫৮ সালের লেবানন সংকটের সময় ১৫ হাজার সেনা মোতায়েনের পর থেকে অঞ্চলটিতে মার্কিন সামরিক তৎপরতা ক্রমেই বেড়েছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে এই উপস্থিতি ৪০ থেকে ৫০ হাজার সেনায় দাঁড়িয়েছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, অঞ্চলটির অন্তত ১৯টি স্থানে স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক স্থাপনা ব্যবহার করে ওয়াশিংটন।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে এটিই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক প্রস্তুতি। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে ১২০টির বেশি মার্কিন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে, যার মধ্যে এফ-২২, এফ-১৫, এফ-১৬ ও ই-৩ সেন্ট্রি অ্যাওয়াক্স রয়েছে। এসব তৎপরতা কেবল রুটিন মাফিক ঘাঁটি বদল নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের ইঙ্গিত বহন করছে। মার্চ মাসে পেন্টাগনের নির্দেশনায় ইউএসএস ট্রিপোলি ও ইউএসএস বক্সারকেন্দ্রিক অ্যাম্ফিবিয়াস গ্রুপ এবং ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের প্রায় ৪ হাজার ৫০০ সদস্যের মোতায়েন পরিস্থিতিকে আরও ঘনীভূত করেছে।
বর্তমান এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধি যুদ্ধের পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি কি না, তা নিয়ে স্পষ্ট ঘোষণা না থাকলেও ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে বোমাবর্ষণ বাড়তে পারে। তবে কোন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হবে, তা তিনি গোপন রেখেছেন। অনেকে মনে করছেন, সামরিক শক্তি প্রদর্শন মূলত ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং কূটনৈতিক আলোচনার কৌশল মাত্র। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, কোথায় হামলা চালানো হবে—এ ধরনের তথ্য তিনি প্রকাশ করতে পারবেন না।
ইরান গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ ছাড় এবং হামলা বন্ধের একটি প্রস্তাব দিয়েছিল, যা ট্রাম্প প্রশাসন নাকচ করেছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ স্পষ্ট করেছেন যে, ইরানের অর্থ ফেরত দেওয়া বা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়, কারণ এসব আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সাথেও সম্পৃক্ত। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরু হলে তেহরান তার জন্য পূর্ণ প্রস্তুত। তবে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তারা জাতিসংঘে প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো, হরমুজ প্রণালি ও যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অন্যান্য বিষয়ও আলোচনায় আনতে হবে।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার টেক্সাসের ডেন্টনে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, চলমান সংঘাত খুব দ্রুত শেষ হতে পারে। তিনি চুক্তির ক্ষেত্রে ইরানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, কোনো সমঝোতায় না এলে তেহরানকে কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। অর্থনৈতিক চাপের অংশ হিসেবে সম্প্রতি ইরানের রেল ও গাড়ি শিল্পের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়।
Leave a Reply