পরিসংখ্যান বা সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব অনেক সময় বাস্তবতাকে পুরোপুরি তুলে ধরতে পারে না। গণিত ও পরিসংখ্যানের জগতে একে বলা হয় ‘সিম্পসন’স প্যারাডক্স’। এই অদ্ভুত ঘটনার মূল বৈশিষ্ট্য হলো, আলাদা আলাদা উপাত্তের গ্রুপে যে প্রবণতা দেখা যায়, সব গ্রুপকে একত্রিত করলে ফলাফল সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে যেতে পারে। অথচ এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো হিসাবের ভুল থাকে না, সংখ্যাগুলোও মিথ্যা নয়। বিষয়টি একটি কাল্পনিক উদাহরণের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া যাক। একটি পরিসংখ্যানগত ঘটনা, যেখানে আলাদা আলাদা গ্রুপে একটি প্রবণতা একদিকে দেখা যায়, কিন্তু সেই গ্রুপগুলোকে একসঙ্গে করলে প্রবণতাটি উল্টে যায়।
ধরা যাক, দুটি হাসপাতাল A এবং B জটিল অস্ত্রোপচার করে। সার্বিক পরিসংখ্যানে হাসপাতাল A-এর সফলতার হার ৯১.৫ শতাংশ, যেখানে B-এর হার ৭২.৭ শতাংশ। প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে A হাসপাতালটি বেশি ভালো। কিন্তু এই সিদ্ধান্তটি বিভ্রান্তিকর হতে পারে, কারণ এখানে রোগীদের অবস্থার গুরুত্ব বিবেচনা করা হয়নি। রোগীদের যদি সহজ ও গুরুতর এই দুই ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়, তবে দেখা যায় প্রতিটি বিভাগেই আসলে হাসপাতাল B বেশি কার্যকর।
তাহলে প্রশ্ন জাগতে পারে, প্রতিটি ভাগে এগিয়ে থাকার পরও কেন মোট হিসাবে B পিছিয়ে পড়ছে? কারণ, হাসপাতাল A-এর মোট ১০০০ রোগীর মধ্যে ৯০০ জনই ছিল সহজ কেসের রোগী এবং মাত্র ১০০ জন ছিল গুরুতর কেসের। উল্টোদিকে, হাসপাতাল B-এর ১০০০ রোগীর মধ্যে ১০০ জন সহজ কেসের এবং ৯০০ জন ছিল গুরুতর কেসের। অর্থাৎ, কোনো হাসপাতাল ভালো সেবা দিচ্ছে, নাকি তারা মূলত সহজ রোগীদের চিকিৎসা করছে—সেটিই চূড়ান্ত সফলতার হারের পেছনে ভূমিকা রাখছে। ধোঁকাটা লুকিয়ে আছে সংখ্যাগুলোর পেছনের গঠনে ধরো, হাসপাতাল A বেশির ভাগ সহজ রোগীর চিকিৎসা করে, আর হাসপাতাল B – এর কাছে আসে বেশি গুরুতর রোগী। ফলে শুধু সফলতার হার নয়, কোন ধরনের রোগী কতজন ছিল, সেটাও চূড়ান্ত সংখ্যাটিকে প্রভাবিত করেছে। তাহলে রোগী হিসেবে তুমি কোথায় যাবে। উত্তরটা হলো, মোট হারের দিকে না তাকিয়ে নিজের কেসটা কোন ভাগে পড়ে, সেটা দেখো। তোমার কেস সহজ হলেও B এগিয়ে, গুরুতর হলেও B এগিয়ে—তাই তোমার জন্য উত্তর B, মোট হিসাব যা-ই বলুক।
এই প্যারাডক্সটি কেবল কাল্পনিক নয়, বাস্তবের গবেষণাতেও এর নজির রয়েছে। ১৯৭৩ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির স্নাতকোত্তর ভর্তির তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়েও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী আবেদনকারীদের তুলনায় পুরুষদের ভর্তির হার অনেক বেশি, যা লিঙ্গবৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু যখন বিভাগভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করা হলো, দেখা গেল পরিস্থিতি ভিন্ন। অনেক বিভাগে নারী আবেদনকারীদের ভর্তির হার পুরুষদের সমান বা বেশি ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক হিসাবে যে অসামঞ্জস্য দেখা গিয়েছিল, তার কারণ ছিল আবেদনকারীদের পছন্দের বিভাগ। নারীদের একটি বড় অংশ অধিক প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে আবেদন করেছিলেন, যেখানে ভর্তির হার সামগ্রিকভাবে কম ছিল। অন্যদিকে, পুরুষ আবেদনকারীরা এমন সব বিভাগে বেশি আবেদন করেছিলেন যেখানে ভর্তির হার তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। ফলে আলাদা বিভাগ অনুযায়ী হিসাব করলে যে সত্য পাওয়া যায়, সব বিভাগ মিলিয়ে গড় করলে তার চিত্র বদলে যায়।
পরিশেষে, পরিসংখ্যান বা গড় হিসাব নিয়ে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। সিম্পসন’স প্যারাডক্স আমাদের সতর্ক করে যে, গড় কখনো কখনো বাস্তবতাকে সহজ করে দেখানোর আড়ালে প্রকৃত সত্যকে লুকিয়ে ফেলে। তাই যেকোনো তথ্যের গভীরতর বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
Leave a Reply