রংপুরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থায়ন, জ্বালানিসংকট ও উচ্চ উৎপাদন ব্যয়। রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এমদাদুল হক জানান, মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ ও জটিল শর্তের কারণে উদ্যোক্তারা চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলো র রংপুর প্রতিনিধি আলতাফ হোসেন। এ ক্ষেত্রে শতরঞ্জির কথা উল্লেখ করা যায়। মূল্যস্ফীতি, ঋণ পাওয়ার সীমাবদ্ধতা ও নানা দুর্বলতার কারণে ব্যবসায়ীরা এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, কঠিন শর্ত ও ঋণ বিতরণে জটিলতার কারণে অনেক উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে পারছেন না।
এমদাদুল হকের তথ্যমতে, বর্তমানে রংপুরের ব্যবসা-বাণিজ্যের ভিত্তি মূলত কৃষি ও কৃষিনির্ভর বিভিন্ন শিল্প। ধান, ভুট্টা, আলু, শাকসবজি ও তামাকের মতো পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়াও চাল, সার, কীটনাশক ও পাটজাত পণ্যের ব্যবসা এখানকার অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। এছাড়া স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আবাসন খাতের মতো সেবা খাতগুলোও বিকশিত হচ্ছে। তবুও শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ায় প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কারখানা বর্তমানে বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে আছে। আর ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আংশিক সক্ষমতায় তাদের উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি নার্সারি ও উদ্যানভিত্তিক ব্যবসারও প্রসার ঘটছে।
শিল্পের এই দৈন্যদশার পেছনে চারটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
প্রথমত, ব্যাংকঋণ প্রাপ্তির জটিলতা ও উচ্চ সুদ।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ধীরগতি। তৃতীয়ত, ১৯৭৮-৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত রংপুর বিসিক শিল্পনগরের বেহাল দশা। সেখানে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংকট, বর্ষায় জলাবদ্ধতা এবং নিরাপত্তার ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে দ্বিতীয় একটি বিসিক শিল্পনগর প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন। চতুর্থত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অপর্যাপ্ততা এবং ব্যয় বৃদ্ধি উৎপাদনশীলতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও এই অঞ্চলটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। বর্তমানে গুটিকয়েক হিমাগার, রাইস মিল ও পাটকল থাকলেও কৃষিপণ্যের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রংপুর চেম্বার কর অবকাশ বা ট্যাক্স হলিডে সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এমদাদুল হক বলেন, বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে ১০ বছরের কর অবকাশ এবং শিল্প, কৃষি ও অবকাঠামো খাতে বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন।
রংপুর বিভাগে চারটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। উদ্যোক্তাদের পরামর্শ হলো, সবগুলোর অপেক্ষা না করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তত একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত চালু করা। সেখানে প্রয়োজনীয় পরিষেবা নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে এবং খাদ্যশিল্প, হালকা প্রকৌশল ও প্লাস্টিকজাত পণ্যের মতো খাতে বড় বিনিয়োগ আসবে। রংপুরের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্পের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
ইতিবাচক দিক হলো, রংপুর অঞ্চলে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। শতরঞ্জি, হস্তশিল্প, বুটিকস, ই-কমার্স, ফ্রিল্যান্সিং ও ক্যাটারিংয়ের মতো নতুন ধারার ব্যবসায় তারা সফলভাবে যুক্ত হচ্ছেন। তাদের এই উদ্যোগগুলো কর্মসংস্থান তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে সামগ্রিক শিল্প বিকাশের জন্য সরকারি পর্যায়ে নীতি সহায়তা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন দ্রুত কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা।
Leave a Reply