দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে স্পোর্টসওয়্যারের বাজারে একক আধিপত্য বজায় রাখা মার্কিন ব্র্যান্ড নাইকি বর্তমানে ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ধারাবাহিক রাজস্ব হ্রাস, গ্রাহকদের আগ্রহ হারানো এবং তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়ে কোম্পানিটি এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছে। সম্প্রতি এর প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারেও, যার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোর বিশেষ সূচক ‘এসঅ্যান্ডপি ১০০’ ইনডেক্স থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে নাইকিকে।
কোম্পানির আর্থিক অবস্থার অবনতি স্পষ্ট হয়েছে সর্বশেষ প্রান্তিক রাজস্ব প্রতিবেদনে। ১১ বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব অর্জন করলেও তা বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক কম ছিল। বিশেষ করে চীনের বাজারে কোম্পানিটির বিক্রি ২৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আর্থিক ভারসাম্য ফেরাতে ২০৩১ সালের মধ্যে আড়াই বিলিয়ন ডলার ব্যয় সংকোচনের পরিকল্পনা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ, যার বড় একটি প্রভাব পড়তে পারে কর্মীবাহিনীর ওপর—অর্থাৎ নতুন করে ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই নেতিবাচক আর্থিক খবরের পরপরই নিউইয়র্কের শেয়ারবাজারে নাইকির শেয়ার দর ৮ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। এছাড়া ২০৩১ সালের মধ্যে ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ কমানোর পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি, যা নতুন করে কর্মী ছাঁটাইয়ের বার্তা দিচ্ছে।
নাইকির এই করুণ দশা নিয়ে স্পোর্টস রিটেইল ইন্ডাস্ট্রির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ম্যাট পাওয়েল বলছেন, বেশ কিছু ভুল কৌশলগত সিদ্ধান্ত এর জন্য দায়ী। বিশেষ করে ইবের সাবেক প্রধান ও নাইকির সাবেক সিইও জন ডোনাহোর আমলে রিটেইল বিক্রেতাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে সরাসরি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিক্রির ওপর জোর দেওয়া হয়। এছাড়া নতুন উদ্ভাবনের চেয়ে ডিজিটাল কার্যক্রমে বেশি বাজেট ব্যয় করায় পণ্য তৈরির নিজস্ব ধারায় কোম্পানিটি পিছিয়ে পড়ে। আবার ‘জর্ডান’ ব্র্যান্ডের অতিরিক্ত সরবরাহের ফলে এর বাজার আকর্ষণও কমেছে, যা এখন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
ব্র্যান্ডটির ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত এসেছে তারকা খেলোয়াড়দের সাথে বিচ্ছেদের কারণে। বিশ্বসেরা ফুটবল তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে দীর্ঘ ২০ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করে সুইজারল্যান্ডের ব্র্যান্ড ‘অন’-এ যোগ দিয়েছেন। এর আগে স্প্যানিশ তরুণ তুর্কি লামিনে ইয়ামালও নাইকি ছেড়ে অ্যাডিডাসে যোগ দেন। তারকাদের এভাবে হাতছাড়া হওয়া নাইকির জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে কোম্পানিকে পুরনো গৌরবে ফেরাতে দুই বছর আগে অবসর ভেঙে সিইও হিসেবে ফিরেছেন এলিয়ট হিল। তিনি নতুন কৌশল নিয়ে কাজ করছেন, যদিও বিশ্লেষকদের মতে এই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতির। একইসাথে নতুন প্রজন্মের গ্রাহকদের মনোযোগ পেতে ‘হোয়াই ডু ইট?’ ক্যাম্পেইন শুরু করেছে ব্র্যান্ডটি। বিশ্লেষক ম্যাট পাওয়েলের মতে, নাইকি ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে এবং হয়তো আগামী বছরই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে আগের মতো একক একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখা তাদের জন্য কঠিন হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
Leave a Reply