নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় মডেল ও অভিনেতা দিনো মোরিয়া এখন ক্যারিয়ারের চেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন আইনি ঝামেলা ও পুলিশের জেরার কারণে। সর্বশেষ মুম্বাইয়ের মিঠি নদীর পলি অপসারণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে মুম্বাই পুলিশ। ২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে তদন্তকারীরা তাঁর বাসায় গিয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও নথিপত্র যাচাই করেন। পরবর্তীতে তাঁকে পুলিশ সদর দপ্তরে নিয়ে ছয় থেকে আট ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। দিনো পুলিশ দপ্তর থেকে বেরিয়ে গেলেও তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, প্রয়োজনবোধে তাঁকে আবারও ডাকা হতে পারে। তারপর অবশ্য পথটা সব সময় মসৃণ ছিল না। দিনোর ক্ষেত্রেও পথটা ছিল অনেকটা একই। একসময় আলোচনায় প্রেমও দিনো মোরিয়ার ব্যক্তিজীবনও তাঁর জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ ছিল।
তদন্তকারী সংস্থাগুলোর ভাষ্যমতে, দিনো মোরিয়া ও তাঁর ভাই স্যান্টিনো রোকো মোরিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন ব্যক্তির যোগাযোগের তথ্য ফোন রেকর্ড থেকে পাওয়া গেছে। তাঁদের পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে। মিঠি নদী পরিষ্কার ও পলি অপসারণের কাজে প্রায় ৬৫ কোটি ৫৪ লাখ রুপির অনিয়ম বা ভুয়া কাজের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে মুম্বাই পুলিশের অর্থনৈতিক অপরাধ দমন শাখা। এর আগেও ২০২৫ সালের মে মাসে তাঁকে এই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। এরপর দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমাতেও কাজ করেন।
মিঠি নদীর মামলা ছাড়াও ২০২৬ সালে দিশা সালিয়ানের মৃত্যুর ঘটনাটি নিয়ে ফের আইনি জটিলতায় পড়েছেন দিনো। সুশান্ত সিং রাজপুতের সাবেক ম্যানেজার দিশা সালিয়ানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তাঁর বাবা সতীশ সালিয়ান বোম্বে হাইকোর্টে নতুন করে তদন্তের আবেদন জানিয়েছিলেন। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিবিআই ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে এফআইআর দায়ের করেছে। এই নথিতে দিনো মোরিয়া, রিয়া চক্রবর্তী, সুরজ পাঞ্চোলি, আদিত্য ঠাকরে ও রোহান রায়ের মতো ব্যক্তিদের নাম রয়েছে। তবে নাম থাকলেই অভিযুক্ত হওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত নয়; আইন অনুযায়ী তদন্তকারীরা এসব ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করে দেখছেন।
দিনো মোরিয়ার বলিউডে যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সালে গ্ল্যাডর্যাগস ম্যানহান্ট প্রতিযোগিতায় সাফল্যের হাত ধরে। সুদর্শন ও সুঠাম দেহের কারণে দ্রুতই ফ্যাশন জগতে তিনি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। ১৯৯৯ সালে ‘পেয়ার মে কভি কভি’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর। তবে ২০০২ সালে বিক্রম ভাট পরিচালিত ‘রাজ’ সিনেমাটি তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বিপাশা বসুর সঙ্গে তাঁর এই জুটি সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। বিক্রম ভাটের পরিচালনায় ছবিতে বিপাশা বসুর বিপরীতে অভিনয় করে দর্শকের নজরে আসেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে ‘গুনাহ’, ‘প্ল্যান’, ‘রক্ত’, ‘আকসর’, ‘ফাইট ক্লাব’ ও ‘টম, ডিক অ্যান্ড হ্যারি’-র মতো বেশ কিছু সিনেমায় অভিনয় করলেও তিনি প্রথম সারির নায়ক হিসেবে নিজেকে স্থায়ী করতে পারেননি। তবে ব্যক্তিগত জীবন, বিশেষ করে বিপাশা বসুর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক নিয়ে তিনি অনেক দিন আলোচনায় ছিলেন। পরবর্তীতে ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অনেক বেশি গোপনীয়তা বজায় রেখেছেন। শাহরুখ খান, অর্জুন রামপালসহ অনেকেই মডেলিং থেকে সিনেমায় এসেছেন।
২০১০-এর পরবর্তী সময়ে বলিউডে যখন নতুন ধারার গল্পের জোয়ার আসে, তখন দিনো ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নিজেকে মেলে ধরেন। ‘দ্য এম্পায়ার’, ‘তাণ্ডব’, ‘কৌন বনেগি শিখরবতী’ ও ‘মেন্টালহুড’-এর মতো ওয়েব সিরিজে তাঁর অভিনয় সমাদৃত হয়। বিশেষ করে ২০২১ সালের ‘দ্য এম্পায়ার’ ওয়েব সিরিজে মোঘল আমলের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ইন্ডিয়ান টেলিভিশন একাডেমি অ্যাওয়ার্ডও জিতেছিলেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁকে বড় বাজেটের সিনেমা ‘হাউসফুল ৫’-এও দেখা গেছে। কিন্তু বর্তমানে তাঁর ক্যারিয়ারের চেয়ে বিভিন্ন তদন্ত ও আইনি মারপ্যাঁচই মিডিয়ার শিরোনামে বেশি জায়গা করে নিয়েছে। একের পর এক সিনেমা, কিছু সাফল্য, অনেক ব্যর্থতা, ধীরে ধীরে বড় পর্দা থেকে দূরে সরে যাওয়া—আবার ওটিটির হাত ধরে নতুন করে আলোচনায় ফেরা। ‘দ্য এম্পায়ার’-এ ভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
Leave a Reply