উপমহাদেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের প্রভাব ও এর দীর্ঘমেয়াদী ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার পালাবদল বা পরিবর্তনের আলোচনায় বারবার ঘুরেফিরে আসছে নির্দিষ্ট কিছু পরিবারের নাম। অথচ প্রশ্ন উঠছে, এই পরিবারগুলোর বাইরে রাষ্ট্রের প্রধান বা সরকার প্রধান হিসেবে বিকল্প কোনো নেতৃত্ব কি উঠে আসতে পেরেছে? যদি আমরা গত কয়েক দশকের ক্ষমতার দৃশ্যপট বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যায় ৫৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতা কার্যত তিনটি পরিবারের হাতেই আবর্তিত হয়েছে। মানে এই ৩ পরিবারের হাতেই ৫৫ বছর। বিরাশিতে সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতায় এরশাদ।
১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতার পাদপ্রদীপে ফিরে আসে শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার। পরবর্তীকালে ২০০১ সালে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে জিয়া পরিবার, আর ২০০৮ সালে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে মুজিব পরিবার। ঘটনাক্রমে ২০২৬ সালে এসে আবারও ক্ষমতার সমীকরণে জিয়া পরিবারের নাম সামনে এসেছে। এই চক্রাকার ক্ষমতার চর্চায় উপমহাদেশের রাজনীতি ১৯৪৭ সাল থেকেই এক ধরনের পারিবারিক বলয়ের মধ্যে আটকে আছে বলে অনেকে মনে করেন। আমাদের এ উপমহাদেশে গণতন্ত্রের চর্চা পরিবার তন্ত্রের আড়ালে সেই ১৯৪৭ সালের পর থেকেই। শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে ভিন্ন কিছু দৃষ্টান্তও পাওয়া যায়। নেহেরু পরিবারের বাইরেও কংগ্রেসের হাত ধরে দুজন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। জওহরলাল নেহেরুর মৃত্যুর পর লাল বাহাদুর শাস্ত্রী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া গুলজারিলাল নন্দ সাময়িকভাবে দুবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। নেহেরু পরিবার থেকে নেহেরু ছাড়াও ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, তবে দিনশেষে তারা দলীয় প্রধানের পদটি ধরে রাখতে পারলেও ক্ষমতার মূল নিয়ন্ত্রক সবসময় তাদের পরিবার বা পরিবারের ঘনিষ্টজনরাই থেকেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাষ্ট্র বা দলের নেতৃত্বের আসনটি দীর্ঘ সময় ধরে দলের বাইরের কারো পরিবর্তে দলীয় প্রধানের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা কিংবা ভাই-বোনদের দখলে থাকার প্রবণতাই পরিবারতন্ত্রকে পোক্ত করেছে। এই কাঠামোগত প্রভাবের কারণেই রাজনীতির মূলধারায় নতুন নেতৃত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে এখন নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। পুরনো সেই চর্চা কেন আবার নতুন করে আলোচনার টেবিলে ফিরে এলো, তা এখন জনমনে বড় কৌতুহলের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Leave a Reply