গত ৫ আগস্ট দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে (FCC) আয়োজিত এক অডিও সংবাদ সম্মেলনে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিসেম্বর নাগাদ দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তার এই ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ সমর্থক ও ভারতপন্থী মহলে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তবে পরবর্তীতে ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির রায় ঘোষণার পর পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট কিছুটা পরিবর্তিত হয়। এ সময় একটি ভারতীয় গণমাধ্যমের সাথে টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানান, তিনি এখন আর দলবল নিয়ে নয়, বরং একাই দেশে ফিরবেন। নিজের আগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, তিনি জেনেশুনে অন্য নেতাদের বিপদের মুখে ঠেলে দিতে চান না। তবে নেতারা তাদের নিজস্ব ইচ্ছানুযায়ী দেশে ফিরতে পারবেন বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন। হত্যা-নির্মূলের নির্দেশ দিতে তার বিবেকে এতটুকু বাধেনি।
শেখ হাসিনা পুনর্ব্যক্ত করেন যে, দেশে ফেরা মাত্রই গ্রেপ্তার এমনকি সর্বোচ্চ শাস্তির সম্ভাবনা থাকলেও তার যাত্রাপথে কোনো কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। তার মতে, তার অনুপস্থিতিতে দেশের মানুষ যে অশেষ দুর্ভোগে আছে এবং দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর যে সরকারি জুলুম ও নির্যাতন চলছে, তা থেকে মুক্ত করার জন্য তার দেশে ফেরা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই। তিনি দাবি করেন, দলের দুঃসময়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি গ্রেপ্তার ও মৃত্যুর ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত আছেন। এসব মহল তাদের বহুলাংশে মনগড়া ও আজগুবি বিশ্লেষণে তার দেশে ফেরার ঘোষণায় এমন মনোভাব ব্যক্ত করছেন, যা শুনে মনে হতে পারে তার দেশে ফেরা একেবারে নিশ্চিত এবং এই সিদ্ধান্তের হেরফের হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। দেশে ফেরার পর তার নেতৃত্বে বর্তমান কথিত জঙ্গিবাদী সরকারের স্থলে দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির পুনর্জন্ম হবে। এর ফলে তার দেশে ফেরা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যে সৃষ্ট সন্দেহ-সংশয় আরও ঘনীভূত হতে দেখা যায়। পরিহাসের বিষয় (Ironically), দীর্ঘ দেড় দশকের অধিককালব্যাপী তার শাসনামলে তিনি বিরোধী নেতা-কর্মীদের গণহারে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ, গুম, খুন, হত্যা, আয়নাঘর এবং সর্বোপরি আরও দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার উগ্র ও একপ্রকার বিকৃত ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে তার স্বৈরশাসনের। তার মতো এহেন একজন ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে’র মুখ থেকে দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্টে ব্যথিত হওয়ার বক্তব্যকে আর যা-ই হোক তামাশা ও মায়াকান্না (Crocodile tears) ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যায় কি না, সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তবে তার এই দাবির বিপরীতে ‘স্মোকিং গান’ বা অকাট্য প্রমাণের বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। বন্দুকধারী ব্যক্তির বন্দুকের নল থেকে ধোঁয়া বের হওয়া যেমন খুনের নিশ্চিত প্রমাণ, তেমনি জেনারেল জিয়াউল আহসানের শাসনামলের টেলিফোন রেকর্ডিংগুলোকে তার অপকর্মের স্মোকিং গান হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সংস্থার প্রধান থাকাকালীন তার কর্মকাণ্ডের সাথে শেখ হাসিনার যোগসূত্র নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, তা তার নির্দোষ দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তার অন্ধ সমর্থক ছাড়া সাধারণ মানুষ তার এই আত্মপক্ষ সমর্থনকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে মনে করা হচ্ছে। বন্দুক হাতে থাকা এক ব্যক্তির সামনে গুলিবর্ষণে নিহত কয়েক ব্যক্তির দেহ পড়ে রয়েছে এবং বন্দুকধারী ব্যক্তির বন্দুকের নল দিয়ে তখনো ধোঁয়া বেরোচ্ছে (Smoking Gun) দেখার পরও নিহত ব্যক্তিদের খুনি কে তা নিয়ে যেমন সন্দেহের তেমন অবকাশ থাকে না, তেমনিভাবে বিপুল সংখ্যক।
ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ টেনে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ওপর যেমন আড়িপাতার যন্ত্র বসানোর দায় ছিল, তেমনি শেখ হাসিনার শাসনামলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ওপরও কঠোর নজরদারি ও অনুসন্ধানের দাবি জোরালো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, দেশের স্বার্থের চেয়ে ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের খাতিরে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ শেষ হওয়ার পরও তা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংকটের মতো বিষয়গুলোও সরকারের তৎকালীন অদূরদর্শী নীতির কারণেই দেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে বলে অনেকে মনে করেন।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির খবরও পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকার গুলশানে আওয়ামী সমর্থক মিছিল থেকে প্রায় ১৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কেরানীগঞ্জে এক নেতার বাসা থেকে ককটেল ও মুখোশ তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনা প্রমাণ করে যে, দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। যাদের জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করছেন, তাদের অনেকেই বিদেশে নিরাপদে জীবনযাপন করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। জনমনে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, শেখ হাসিনা ও তার দলের নেতারা অতীতে গুম, খুন ও আয়নাঘরের মতো যে কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছিলেন, তার বিচারপ্রক্রিয়ায় আত্মসমর্পণের সময় ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাবে।
Leave a Reply