কক্সবাজারের চকরিয়ায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় মোহাম্মদ ইয়াসিন (১৮) নামের এক তরুণসহ দুজন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নের নয়াপাড়া সবুজ পাহাড় এলাকায় একটি বাসের সঙ্গে পিকআপভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত অপর ব্যক্তি হলেন টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের ফুলের ডেইল এলাকার বাসিন্দা আব্দুল্লাহ (২৭)। ইয়াছিনের বয়স হয়েছিল মাত্র ১৮ বছর।
মায়ের সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে শেষ কথা হয়েছিল ইয়াসিনের। সেসময় পিকআপে সবজি তোলা নিয়ে ব্যস্ত ছিল ইয়াসিন। মা শওকত আরা জানতে চেয়েছিলেন ছেলে কোথায় যাচ্ছে, তখন ইয়াসিন জানায় সবজি নিয়ে টেকনাফে যাচ্ছে এবং সকালে ফিরে আসবে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা আর হলো না ইয়াসিনের; সকালে সে ফিরল, তবে নিথর দেহে। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে মা শুনলেন, ছেলে আর নেই। শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা। ঘরের বারান্দা থেকে ভেসে আসছিল কান্নার শব্দ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন শওকত আরা।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ইয়াসিনের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল নিজের একটি পিকআপভ্যান কেনার।
তার সেই শখ পূরণে বাবা-মা মাত্র ১৫ দিন আগে ৭ লাখ টাকা দিয়ে তাকে গাড়িটি কিনে দিয়েছিলেন। গাড়িটি কেনার পর প্রথম ১০-১২ দিন একজন চালক চালালেও, বুধবার থেকে ইয়াসিন নিজেই সেটি নিয়ে রাস্তায় নামে। চট্টগ্রামে একটি ট্রিপ শেষ করে বৃহস্পতিবার চকরিয়ায় ফিরে রাতেই টেকনাফের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে সে মৃত্যুর মুখে পড়ে। ছেলেকে আর কোনো দিন ফিরে পাবেন না, এ সত্য যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি। মা-বাবার কাছে আবদার করেছিলেন পিকআপ কিনে দেওয়ার। ছেলের সেই ইচ্ছা পূরণ করতে ১৫ দিন আগে ৭ লাখ টাকা দিয়ে একটি পিকআপ কিনে দেন তাঁরা। ১৫ দিন আগে পিকআপটি কিনে দেওয়া হয়। গত বুধবার চালককে নামিয়ে দিয়ে নিজেই পিকআপ নিয়ে বের হন ইয়াছিন। সেদিন একটি ভাড়া নিয়ে চট্টগ্রামে যান।
চার ভাইবোনের মধ্যে ইয়াসিন ছিলেন তৃতীয়। তাদের পৈতৃক নিবাস বান্দরবানের লামা উপজেলায় হলেও বিগত ২০ বছর ধরে পরিবারটি চকরিয়ার সাহারবিল ইউনিয়নের শাহপুরা এলাকায় নানাবাড়িতে বসবাস করছে। বড় ভাই মোহাম্মদ সৈয়দ হোসেন মালয়েশিয়াপ্রবাসী, বড় বোন জান্নাতুল নাইমা (২২) এবং ছোট ভাই মোহাম্মদ রবিউল হোসেন (১৫) রাজমিস্ত্রির কাজ করে। বাবার মোহাম্মদ দুলালের ব্যবসা রয়েছে লামায়। বড় ভাই মোহাম্মদ সৈয়দ হোসেন (২৬) মালয়েশিয়াপ্রবাসী।
শুক্রবার বিকেলে শাহপুরা এলাকায় নানাবাড়ির উঠানে যখন ইয়াসিনের মরদেহ রাখা হয়, তখন স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে আশপাশের পরিবেশ। মা শওকত আরার বুকফাটা আর্তনাদে উপস্থিত সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ইয়াসিনের বড় বোন জান্নাতুল নাইমা জানান, যে গাড়িটি কেনার জন্য ইয়াসিন বায়না ধরেছিল, সেই গাড়িই শেষ পর্যন্ত তার প্রাণ কেড়ে নিল। বাড়ির উঠানে ছেলের নিথর দেহের পাশে স্বজনদের কান্নায় স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, একজন তরুণের মৃত্যু কীভাবে তছনছ করে দিতে পারে একটি পরিবারকে।
নিহত আব্দুল্লাহ চকরিয়া থেকে নিজের বাড়িতে ফেরার পথে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন। শুক্রবার বিকেলে শাহপুরা জামে মসজিদ মাঠে জানাজা শেষে ইয়াসিনকে স্থানীয় সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। ১৫ দিন আগে ৭ লাখ টাকার পিকআপ ঘিরে যে নতুন স্বপ্নের সূচনা হয়েছিল, অকাল সড়ক দুর্ঘটনায় তার এমন করুণ পরিণতি পুরো পরিবারকে তছনছ করে দিয়েছে।
Leave a Reply