পিরোজপুরের শংকরপাশা ইউনিয়নের বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী (৮৭) পরলোকগমন করেছেন। শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই পিরোজপুরে শেষকৃত্য আয়োজন নিয়ে ব্যাপক টানাপোড়েন ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। অবশেষে শনিবার দিবাগত রাত ১টা থেকে ২টার দিকে তার নিজ বাড়িতেই দাফন সম্পন্ন হয়। আজ রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে মানিক পশারীর মৃত্যু হয়। সেখানে অবস্থানকালে গত দুই মাস ধরে তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। পুলিশ লাইন থেকে শংকরপাশা ইউনিয়নে যাওয়ার পথে বিভিন্ন স্থানে লোকজনের জড়ো হওয়ার খবরও পাওয়া যায়।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, মানিক পশারীর দাফন এবং রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীরা বাধা দিয়েছেন। এই পরিস্থিতির কারণে জেলাজুড়ে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তার স্বার্থে দুপুরে পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে গার্ড অব অনারের প্রস্তুতি চললেও শেষ পর্যন্ত মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি কঠোর পুলিশি পাহারায় পিরোজপুর পুলিশ লাইনে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, শেষ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরাই নিজেরাই কবর খুঁড়তে বাধ্য হন। দাফন নিয়ে জটিলতার কারণে পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। একপর্যায়ে স্ত্রী, মেয়ে, বোনসহ স্বজনেরা নিজেরাই কবর খোঁড়ার উদ্যোগ নেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সেখানে সাংবাদিকসহ অন্যদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মানিক পশারীর মেয়ের জামাই ফারুক হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, দুপুর ১২টার দিকে তাঁরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইফতেখারুল ইসলাম শামীমের কাছে গেলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়। ফারুক হোসেনের অভিযোগ, কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর পুলিশ লাইনের ভেতরে অনেকটা গোপনেই গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এরপর মরদেহ কোথায় এবং কীভাবে দাফন করা হবে, তা নিয়ে পরিবার অনিশ্চয়তায় পড়ে। স্থানীয় কিছু জামায়াত নেতাকর্মী ও সমর্থক দাফনে বাধা দেন বলে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সূত্রের দাবি। এ পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন। একবার কবর খোঁড়ার পর সেটি আবার ভরাট করে দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছেন মানিক পশারীর বোন মোছাম্মৎ রিনা আক্তার। একবার মোরা কবর খুঁড়ছি, সেই কবর লোকজনে আবার ভরাট করে ফেলছে। পরিবারের এ বক্তব্যে দাফন নিয়ে তাঁদের ভোগান্তির চিত্র উঠে এসেছে। জামায়াত নেতার দাবি, তিনি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়েও আপত্তি তুলেছেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক। তবে মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে জামায়াত নেতার এ দাবির সমর্থনে কোনো যাচাইকৃত নথি বা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। জেলা জামায়াতের এক মুখপাত্রের দাবি, দলের পক্ষ থেকে দাফন কাজে কোনো ধরনের বাধা দেওয়া হয়নি। তিনি জানান, রাজনৈতিক বা আদর্শিক ভিন্নমত থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে দাফন বাধাগ্রস্ত করার কোনো উদ্দেশ্য তাদের ছিল না। এদিকে পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শরিফুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, সকল জটিলতা শেষে যথাযথ প্রক্রিয়ায় মরদেহ দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা নিশ্চিত করা হলেও শুরুতে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তিনি বলেন, “আমার ভাইরে টুঙ্গিপাড়া দিয়া পিরোজপুর আনার পর ওখানে ঝামেলা হইছে।
উল্লেখ্য যে, মানিক পশারী ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে পিরোজপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর বিরুদ্ধে চলমান মূল বিচার প্রক্রিয়ার সাথে একীভূত করা হয়। মামলার বাদী এবং অন্যতম প্রধান সাক্ষী হিসেবে মানিক পশারী জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর তিনি নিরাপত্তার কথা ভেবে মেয়ের জামাইয়ের আশ্রয়ে টুঙ্গিপাড়ায় বসবাস করছিলেন। এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
নিহত এই মুক্তিযোদ্ধার শেষকৃত্য নিয়ে যে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা এবং বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, কোনো ব্যক্তির মরদেহ দাফন নিয়ে রাজনীতিকরণ বা বাধার ঘটনা সামাজিকভাবে অনভিপ্রেত এবং আইনের শাসনের পরিপন্থী। পরিবারের পক্ষ থেকে ওঠা এই গুরুতর অভিযোগ এবং পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
Leave a Reply