ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আট মাস ধরে চলা সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ পাঠাচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। এর আগে থেকেই অঞ্চলটিতে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক এক মাস আগে এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের অষ্টম মাস চলছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যের বড় ও স্থায়ী ঘাঁটির পাশাপাশি ছোট ছোট ঘাঁটিতে মোতায়েন ছিল।
মার্কিন প্রশাসনের একটি সূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে, গত রবিবার সান দিয়েগো ঘাঁটি থেকে ‘ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট’ রণতরীটি মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে। এর পরপরই প্রায় দুই হাজার মেরিন সেনা নিয়ে ‘মার্কিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট’ (এমইইউ) অঞ্চলটির দিকে রওনা দিয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যমতে, এই নৌবহর মোতায়েনের ফলে পর্যায়ক্রমে অতিরিক্ত ৯ থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনাসদস্য ওই অঞ্চলে যুক্ত হতে পারে। এর এক দিন পর মার্কিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটও (এমইইউ) রওনা হয়েছে, যাতে ২ হাজারের বেশি মেরিন সেনা রয়েছে।
নভেম্বরের শেষ নাগাদ এই প্রক্রিয়ার আওতায় তিনটি বিমানবাহী রণতরী ও দুটি উভচর অবতরণকারী দল ইরানের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থান নেবে। এই সামরিক সমাবেশ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রয়োজনে যেকোনো বিস্তৃত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ করে দেবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি নির্বাচনে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
নতুন এই সামরিক কৌশলের অংশ হিসেবে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের ভাষ্যমতে, কূটনীতির পথ খোলা থাকলেও সামরিক পদক্ষেপের সক্ষমতা নিশ্চিত রাখাই এই মোতায়েনের মূল লক্ষ্য। এমনকি ইরানের সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক চুক্তি সম্পাদিত হলেও সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা পেন্টাগনের নেই। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্পষ্ট করেছেন যে, ট্রাম্প কোনো হামলার নির্দেশ দিলে তা বাস্তবায়নের জন্য বাহিনীগুলো সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার তানিয়া নুরি জানিয়েছেন, নতুন এই প্রক্রিয়ায় এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে নুরি জানান, এর লক্ষ্য হলো কূটনীতির গতিপথ যা-ই হোক না কেন, ট্রাম্পের জন্য সামরিক পদক্ষেপের বিকল্পটি যেন সব সময় খোলা থাকে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ১৯টি ভিন্ন স্থানে স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। এর মধ্যে বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে আটটি স্থায়ী মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মোতায়েনের ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৫৮ সালের জুলাই মাসে লেবানন সংকটের সময় প্রথমবারের মতো বৈরুতে সেনা পাঠিয়েছিল ওয়াশিংটন, যেখানে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার সেনার উপস্থিতি ছিল। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা পাঠানোর প্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৯৫৮ সালের জুলাইয়ে।
চলতি বছরের শুরু থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি ক্রমাগত জোরদার করছেন। এর অংশ হিসেবে আরব সাগরে ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ রণতরীসহ একাধিক যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা ও নতুন করে সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্তকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের অংশ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
Leave a Reply