বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনায় সাম্প্রতিক সময়ে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। যে দেশ একসময় বড় আকারের হজ কোটা পেয়েও তা পুরোপুরি ব্যবহার করতে ব্যর্থ হতো, সেই দেশই এখন নির্ধারিত কোটার বাইরে বাড়তি ২০ হাজার মানুষের হজে যাওয়ার সুযোগের দাবিতে সরব হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে যেমন চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্নের অবকাশ। বর্তমানে সৌদি সরকার বাংলাদেশের জন্য হজ কোটা ৭৮ হাজার ৫০০ জনে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। অথচ এই কোটা প্রায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পরও অতিরিক্ত ২০ হাজার হজযাত্রীকে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছে। যে বাংলাদেশ একসময় বড় কোটা পেয়েও তা পূরণ করতে পারেনি, সেই বাংলাদেশই এখন ৭৮ হাজার ৫০০ আসনের বাইরে থাকা আরো ২০ হাজারের বেশি মানুষকে হজে পাঠানোর জন্য অতিরিক্ত কোটার অনুরোধ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের পরিবারের কিছু সদস্য নিবন্ধিত হয়েছেন। কিন্তু ওই বছর ৮৫ হাজার ২৫৭ জন বাংলাদেশি হজ পালন করেন। ফলে প্রায় ৪২ হাজার আসন অব্যবহৃত থাকে।
পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বাংলাদেশের হজযাত্রীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছিল। অথচ ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সৌদি আরব বাংলাদেশকে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জনের পূর্ণ কোটা দিয়েছিল। এর মধ্যে ২০২৫ সালে প্রাথমিক নিবন্ধন শেষে মাত্র ৮৩ হাজার ৫২৭ জন নিবন্ধন সম্পন্ন করায় ৪৩ হাজার ৬৭১টি আসন খালি রয়ে যায়। চাহিদার তুলনায় হজযাত্রী না পাওয়ায় সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সৌদি সরকার ২০২৭ সালের জন্য বাংলাদেশের হজ কোটা কমিয়ে ৭৮ হাজার ৫০০ জনে নামিয়ে আনে। এখন সেই সীমিত কোটার বিপরীতে অতিরিক্ত ২০ হাজার হজযাত্রীর চাপ তৈরি হয়েছে, যা আগের ব্যর্থতার চিত্রকে ভিন্নভাবে সামনে নিয়ে আসছে। ২০২৭ সালে বাংলাদেশেরর কোটা কমে যাওয়া কি কেবল সৌদি আরবের একক সিদ্ধান্তেই হয়েছে।
কোটা কমার পাশাপাশি ২০২৭ সালের হজ প্যাকেজের মূল্য নিয়েও হজযাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সরকারিভাবে ২০২৭ সালের জন্য সর্বনিম্ন হজ প্যাকেজের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৫ হাজার ৬৪৮ টাকা। এর বিপরীতে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সর্বনিম্ন প্যাকেজ ধরা হয়েছে ৫ লাখ ১৩ হাজার ৬৪৮ টাকা। এবারের প্যাকেজে বিমান ভাড়া আগের তুলনায় ২৪ হাজার ৮৩০ টাকা কমিয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলেও সামগ্রিক খরচ আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালে সর্বনিম্ন প্যাকেজ ছিল ৪ লাখ ৬৭ হাজার ১৩৭ টাকা। বিমান ভাড়া কমার পরও প্যাকেজের ব্যয় কেন বৃদ্ধি পেল, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৬ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৯ হাজার ১০০ জন।
কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এবারের প্যাকেজগুলোর গঠন কাঠামোতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন প্যাকেজে খাবারের খরচ হিসেবে ৩৯ হাজার ৫০৮ টাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া সৌদি রিয়ালের বিনিময় হারের সমন্বয়ের কারণে আরও ৩ হাজার ৮২৫ টাকা অতিরিক্ত যোগ হয়েছে। আগের প্যাকেজগুলোতে খাবারসহ এই বাড়তি ব্যয়গুলো আলাদাভাবে হজযাত্রীদের বহন করতে হতো, যা এবার প্যাকেজের মূল মূল্যের ভেতরেই অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে। কোটা সংকটের এই জটিল পরিস্থিতিতে ২০ হাজার অতিরিক্ত হজযাত্রীর আবেদন শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা এখন দেখার বিষয়। সব মিলিয়ে হজ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক সমন্বয় নিয়ে এক ধরনের অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে, যা সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালে শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থাপনা দলের সদস্যসহ প্রায় ৮৭ হাজার ১০০ জন বাংলাদেশি হজ পালন করেন।
Leave a Reply